রবিবার, মে ১৯, ২০২৪

আকর্ষণীয় স্থানে পর্যটন করপোরেশনের হোটেল, তবুও করছে লোকসান

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের (বিপিসি) অধীন হোটেল-মোটেলগুলোয় আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেশাদারত্বের ঘাটতিসহ রয়েছে অব্যবস্থাপনা। সেবার মান নিয়ে নানা অভিযোগ আছে। অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও আমলানির্ভরতার কারণে একদিকে যেমন পর্যটক টানতে পারছে না, অন্যদিকে তেমনি লাভের মুখ দেখছে না করপোরেশন।

by ঢাকাবার্তা ডেস্ক
আকর্ষণীয় স্থানে পর্যটন করপোরেশনের হোটেল, তবুও করছে লোকসান

স্টাফ রিপোর্টার।।

হোটেল-মোটেলগুলোর বেশির ভাগেরই অবস্থান আকর্ষণীয় জায়গায়। নিরাপত্তাব্যবস্থাও ভালো। তবু সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত এসব স্থাপনায় অবকাশযাপনে পর্যটকদের আগ্রহ নেই বললেই চলে। অথচ তাঁরা দেশের বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রে বেসরকারি হোটেল-মোটেলে থাকতে দুই-তিন গুণ বেশি টাকা খরচ করছেন।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের (বিপিসি) অধীন হোটেল-মোটেলগুলোয় আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেশাদারত্বের ঘাটতিসহ রয়েছে অব্যবস্থাপনা। সেবার মান নিয়ে নানা অভিযোগ আছে। অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও আমলানির্ভরতার কারণে একদিকে যেমন পর্যটক টানতে পারছে না, অন্যদিকে তেমনি লাভের মুখ দেখছে না করপোরেশন।

অথচ দেশের প্রথম আবাসিক হোটেলের যাত্রা শুরু হয় সরকারি এই প্রতিষ্ঠানের হাত ধরে। ২০১৮-১৯ অর্থবছর থেকে টানা লোকসানে ঘুরপাক খাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। গত অর্থবছর (২০২২-২৩) পর্যন্ত গড়ে ১০ কোটি টাকা করে লোকসান গুনতে হয়েছে। বেশ কয়েকটি হোটেল-মোটেল আকর্ষণীয় স্থানে থাকার পরও কেন লাভ করতে পারছে না, সে প্রশ্ন উঠেছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় থেকেই। যেসব হোটেল-মোটেল ধারাবাহিকভাবে আয়ের লক্ষ্য পূরণ করতে পারবে না, সেসব কেন্দ্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তিরস্কার কিংবা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও ভাবছে মন্ত্রণালয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পর্যটন করপোরেশনের একাধিক কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, কিছু স্থাপনা করা হয়েছে রাজনৈতিক বিবেচনায়। ওই সব স্থানে পর্যটনকেন্দ্র করা ঠিক হয়নি।

পর্যটন করপোরেশনের তথ্য বলছে, সারা দেশে তাদের ৫১টি হোটেল-মোটেল, রেস্তোরাঁ ও বার রয়েছে। এর মধ্যে করপোরেশন পরিচালনা করে ৩৫টি ইউনিট, ইজারা দেওয়া হয়েছে ১৬টি। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বেশির ভাগ ইউনিট লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী আয় করতে পারছে না। গত বছরের নভেম্বর মাসের হিসাব উল্লেখ করে মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৩৫টি বাণিজ্যিক কেন্দ্রের মধ্যে ৩৩টি আয়ের লক্ষ্য পূরণ করতে পারেনি। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য পর্যটন মোটেল সিলেট, জাফলং পর্যটন মোটেল, চট্টগ্রামের হোটেল সৈকত, কক্সবাজারের মোটেল লাবণী, উপল, প্রবাল ও হোটেল শৈবাল। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি আয় হয়েছে রাজধানীর সচিবালয়ে অবস্থিত এক্সিকিউটিভ ক্যাফেটেরিয়া ও আগারগাঁওয়ের ছাদ রেস্তোরাঁ থেকে। ইজারা দেওয়া ইউনিটগুলোর মধ্যে ৬টি কর-পূর্ব (কর পরিশোধের আগেই) ক্ষতির মুখে আছে।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী ফারুক খান  বলেন, ‘পর্যটন করপোরেশনের আওতায় প্রতিষ্ঠানগুলোকে লাভজনক করতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যাতে পর্যটকেরা ভালো সেবা পায়। দেশি বা বিদেশি কোনো কোম্পানি যদি প্রস্তাব নিয়ে আসে, আমরা সেটাকে স্বাগত জানাব।’

শৈবাল, উপল, লাবণীর ‘দুর্দশা’

কক্সবাজারে ১৯৭২ সালে মোটেল উপল চালু করা হয়। এরপর আর সংস্কার করা হয়নি। মোটেলটিতে কক্ষ রয়েছে ৩৮টি। এর মধ্যে গত ১৩ ফেব্রুয়ারি ভাড়া হয় ১২টি, ১৪ ফেব্রুয়ারি ১৬টি। বছরের বেশির ভাগ সময় গড়ে ১০-১২টি কক্ষ ভাড়া হয়। মোটেলটি ঘুরে দেখা গেছে, আসবাবপত্র পুরোনো। কক্ষগুলো স্যাঁতসেঁতে। চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি থেকে আসা নুরুল আমিন প্রথম আলোকে বলেন, না পারতে এখানে এক রাত থেকেছেন তিনি। মোটেল উপলের কর্মকর্তা সৈয়দ রাজীব হোসেন বলেন, লোকবল-সংকট, আসবাবপত্র পুরোনোসহ সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উঠতে না পারায় এখানে পর্যটক কম আসছেন।

 

অবহেলা ও গাফিলতির একই চিত্র মোটেল লাবণীতেও। বেশির ভাগ কক্ষের ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ছে। ঘুণ ধরেছে আসবাবে। মোটেলটি থেকে কয়েক মিনিট হাঁটলে সমুদ্রের লাবণী পয়েন্ট। অথচ বছরের বেশির ভাগ সময় ফাঁকা থাকে এটি। লাবণীর ৬০টি কক্ষের মধ্যে দুই বছর ধরে পরিত্যক্ত ১৫টি। বাকি ৪৫টির অবস্থাও খারাপ। এসব কক্ষের মধ্যে গত ১১ ফেব্রুয়ারি ভাড়া হয় ৪টি, ১২ ফেব্রুয়ারি ৩টি। গড়ে প্রতিদিন তিন-চারটির বেশি কক্ষ ভাড়া হয় না।

লাবণীর ব্যবস্থাপক ওমর ফারুক বলেন, এখানে প্রশিক্ষণকেন্দ্রসহ অত্যাধুনিক হোটেল করার প্রস্তাব রয়েছে। এ জন্য নতুন করে জরাজীর্ণ ভবনের কাজ করা হচ্ছে না। বেশির ভাগ কক্ষ খালি থাকলেও তাঁরা লোকসানে নেই বলে দাবি করেন তিনি।

হোটেল শৈবালে রয়েছে বিশাল পুকুর। দৃষ্টিনন্দন ফুলের বাগান। সুইমিং পুল। অথচ হোটেলটিতে থাকতে পর্যটকদের আগ্রহ নেই। জৌলুশ হারিয়েছে ১৩৫ একর জায়গার ওপর নির্মিত হোটেলটি। সেখানে থাকা ২৪টি কক্ষের মধ্যে গত ১১ ফেব্রুয়ারি ১১টি কক্ষ ভাড়া হয়, ১২ ফেব্রুয়ারি হয় ১২টি। বছরের বেশির ভাগ সময় অর্ধেকের বেশি কক্ষ খালি থাকে। ২০০ কক্ষের অত্যাধুনিক হোটেল নির্মাণের জন্য চার বছর আগে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে উল্লেখ করে হোটেল শৈবালের ব্যবস্থাপক রায়হান উদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, এটি বাস্তবায়িত হলে পর্যটক বাড়বে।

‘সংস্কারের জন্য বিনিয়োগ খোঁজা হচ্ছে’

দেশে পর্যটনশিল্পের উন্নয়ন, এই খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন এবং বিদেশের মাটিতে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার লক্ষ্য নিয়ে ১৯৭৩ সালের ১ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে পর্যটন করপোরেশন। কিন্তু প্রতিষ্ঠার ৫০ বছরেও তেমন এগোতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি।

সরকারি নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, পর্যটক টানতে দেশের বিভিন্ন স্থানে স্থাপনা করা হয়েছে। তবে তা লাভজনক হয়নি। কোথাও আবার স্থাপনা করা হয়েছে সমীক্ষা ছাড়া। যেমন গাজীপুরের সালনা পিকনিক স্পট অ্যান্ড রিসোর্ট। গত নভেম্বরে সেখান থেকে আয় হয় মাত্র ৫ লাখ ১৬ হাজার টাকা। অথচ ব্যয় হয় সাড়ে ছয় লাখ টাকা। ওই মাসে সেখানে কর-পূর্ব ক্ষতি আট লাখ টাকা। মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন বলছে, সালনা রিসোর্টে সুইমিং পুলসহ অনেক সুবিধা নেই। ফলে সেখানে পর্যটকেরা যেতে আগ্রহী হচ্ছেন না।

যশোরের সাগরদাঁড়ি পর্যটনকেন্দ্রটি বছরের বেশির ভাগ সময় খালি পড়ে থাকে বলে মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। সেখানে আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি। জাফলংয়ে মোটেল নির্মাণ করাও ঠিক হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

সরকারের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার তদবিরে চাঁপাইনবাবগঞ্জে সোনামসজিদ স্থলবন্দরে একটি মোটেল করা হয়। সেটিও লাভের মুখ দেখছে না। সিরাজগঞ্জের কাজীপুর উপজেলায় সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের প্রয়াত নেতা মোহাম্মদ নাসিমের নামে চার কোটি টাকা ব্যয়ে একটি পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। সেখানেও লোকসান গুনতে হচ্ছে। নেত্রকোনার আদর্শনগর পর্যটনকেন্দ্রটিও লাভ করতে পারছে না।

পর্যটন করপোরেশনের মহাব্যবস্থাপক (পরিকল্পনা, পরিসংখ্যান ও প্রশিক্ষণ) জিয়াউল হক হাওলাদার বলেন, সরকারকে কর, ভ্যাট, লভ্যাংশ দিতে হয়। সারা দেশে কর্মীদের বেতন দিতে হয়। এ কারণে খুব একটা লাভ হয় না। তবে বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলো লোকসান দিচ্ছে—এটা বলা ঠিক হবে না। দীর্ঘদিন হোটেল-মোটেলগুলোর সংস্কার না হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সংস্কারের জন্য দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ খোঁজা হচ্ছে।

‘পুরোনো ধ্যানধারণায় চলছে করপোরেশন’

সরকারি হোটেল-মোটেল কেন লাভ করতে পারে না, তা জানতে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে একটি কমিটি গঠন করে মন্ত্রণালয়। ওই কমিটি সরেজমিনে পাঁচ মাস সরকারি হোটেল-মোটেল ঘুরে দেখে প্রতিবেদন তৈরি করে। তাতে বলা হয়, অনেক পর্যটনকেন্দ্র বছরের পর বছর সংস্কার করা হয়নি। কোথাও সঠিক জায়গায় স্থাপনা করা হয়নি। কোথাও স্থাপনা করা হয়েছে ছোট পরিসরে। আবার কোথাও পর্যটকদের জন্য তেমন সুযোগ-সুবিধা নেই। এতে পর্যটকেরা সেখানে যেতে চান না। ফলে বাণিজ্যিক ইউনিটগুলো লাভজনক হচ্ছে না।

পর্যটন নিয়ে কাজ করা সংগঠন প্যাসিফিক এশিয়া ট্রাভেল অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব তৌফিক রহমান প্রথম আলোকে বলেন, পুরোনো ধ্যানধারণায় চলছে পর্যটন করপোরেশন। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হোটেল-মোটেল সংস্কার করা হয়নি। সেবার মান ভালো নয়। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেই। প্রচার নেই।

পর্যটন করপোরেশনের সব কটি হোটেল-মোটেল আকর্ষণীয় জায়গায় থেকেও লাভ করতে না-পারা দুঃখজনক মন্তব্য করে তৌফিক রহমান বলেন, অতীতে রাজনৈতিক বিবেচনায় বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিয়ে ক্ষতি হয়েছে। পেশাদার কারও হাতে ছাড়তে না পারলে এসব হোটেল-মোটেল লোকসানি প্রতিষ্ঠান হিসেবেই থাকবে।

আরও পড়ুন: ময়মনসিংহ সিটি নির্বাচনে ৫৫ কেন্দ্রে বিপুল ভোটে এগিয়ে টিটু

You may also like

প্রকাশক : জিয়াউল হায়দার তুহিন

সম্পাদক : হামীম কেফায়েত

গ্রেটার ঢাকা পাবলিকেশন
নিউমার্কেট সিটি কমপ্লেক্স
৪৪/১, রহিম স্কয়ার, নিউমার্কেট, ঢাকা ১২০৫

যোগাযোগ : +8801712813999

ইমেইল : news@dhakabarta.net