বুধবার, মে ২২, ২০২৪

খারাপ ছবিই বিক্রি হয় বেশি —মনিরুল ইসলাম

by ঢাকাবার্তা
নিজের স্টুডিওতে মনিরুল ইসলাম। ফাইল ফটো
গতকাল সন্ধ্যায় আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে আতিয়া ইসলাম অ্যানির প্রদর্শনী দেখতে আসা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক দল শিক্ষার্থীর উদ্দেশ্যে কিছু কথা বলেন শিল্পী মনিরুল ইসলাম। কথার মাঝের প্রশ্নগুলো বাদ দিয়ে সেসব গ্রন্থনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক শিশির ভট্টাচার্য্য

নকলের কথা কইতাছো, আমিইতো কত নকল করছি। শিখছি যহন নকল করতে অইছে না? জয়নুল আবেদিনরেইতো নকল করছি আমি। কে না কইছিল, বুদ্ধিমান অনুপ্রেরণা নিয়া সমৃদ্ধ হয়, বোকারা খালি নকলই করে। আমি কিন্তুক নকলই করছি। নকল করতে করতেই শিখছি। অরিজিনাল বইলা কিছু নাই। আকাশ থেইকা কিছুই পড়ে না। কারও না কারও কাছ থাইকা নিতেই অয়।

যেই কাগজেই তুমি আঁকো, আগে পরে একটু লাল হয়ে যাবেই। এইজন্য আমি বলি, যে জিনিষটার উপর ছবি আঁকবে সেটাকে এ্যাসিড ফ্রি হতে হবে। না হলে ছবি টিকবে না। সুলতান একেবারে ফালতু একটা মিডিয়াম, চটের উপর ছবি এঁকেছে। এখনতো ওনার সব ছবি লালচে হয়ে গেছে, দেখ নাই?

এক সময় আমি নয়াবাজারে গিয়ে কাটুর্ন কুড়িয়ে এনে তার উপর ছবি আঁকতাম। খুব ভালো কাগজ, কিন্তু এ্যাসিড ফ্রি না। আমি নিজে কাগজ বানিয়ে তার উপর ছবি এঁকেছি, এখনও আঁকি। সেলুলজের মণ্ডের মধ্যে আঠা মিশাই। এই যে টাকা দেখো না, টাকাতো কাগজে তৈরি, কিন্তু কত দিন টিকে দেখো। এর কারণ, ওর মধ্যে যে আঠাটা আছে, সেটা সেই রকম ভালো। বাজারে কয়েক রকম আঠা পাওয়া যায়, ‘আইকা’ আছে, ‘ফেবিকল’ বলে একটা আঠা আছে। এক্সপেরিমেন্ট করতে হবে। নিজের কাগজ নিজে বানানোর মজাই আলাদা। স্পেনে তো আমি যত রকম চাই, সব রকম কাগজ ছিল। কিন্তু তবুও আমি নিজে কাগজ বানাইতাম।

চাঁদপুরে নদীর ধারে এক চায়ের দোকানে বসে একবার ছবি আঁকছিলাম, মনে আছে। নিজের রঙ, নিজের কাগজ। ভুষাতে পানি, আঠা মিশাইয়া রঙ বানাইছি, তারপর ছবি আঁকছি। আজকালতো এ্যক্রিলিক রঙ, এ্যাক্রিলিক মানে প্ল্যাস্টিক, বুঝেছো, প্ল্যাস্টিক ছাড়া আর কিছু না। তবে আমার কাছে মিডিয়াম ব্যাপার নয়, হাতের কাছে যা পাই, এই যেমন ধরো, ম্যাগাজিনের একটা পাতা, তাতেই আমি ছবি আঁকি। সমস্যা কী? এক সময় তুলি পুরোনো হলে ফেলে দিতাম। এখন দেখি ছেঁড়া, আধা ছেঁড়া তুলি দিয়ে যে স্ট্রোক দেওয়া যায়, ছবিতে যে একটা ভাব আসে, নতুন তুলিতে সে রকম আসে না।

এভাবেই কথা বলছিলেন মনিরুল ইসলাম।

এভাবেই কথা বলছিলেন মনিরুল ইসলাম।

আমি য়খন মফস্বল চাঁদপুর থেকে ঢাকা এসেছি, রঙ যে টিউবে পাওয়া যায়, জানতামই না। কেনার পয়সাও ছিল না। এখনকার ছেলেমেয়েদেরতো কতো সুবিধা। তবে আমি বলি, বাজারে হরেক রকম রঙ পাওয়া গেলেও নিজে রঙ বানানোর আনন্দ আলাদা। পুঁই শাক, পুঁইয়ের গোটা, কাঠকয়লা, কাগজপোড়া ছাই দিয়ে রঙ বানালে সমস্যা কী। অনেক রকম রঙ বানানো যায়।

স্পেনে আমার এক মার্কিন বন্ধু ছিল সেভিঈ শহরে। মাঝে মাঝে দেখতাম, একদিন পরিচয় হলো। নিজের রক্ত দিয়ে সে ছবি আঁকে। রক্ত দিয়ে কেন, সে নাকি বুল ফাইটার হতে স্পেনে এসেছিল, হতে পারেনি, রক্ত পছন্দ, সুতরাং রক্ত দিয়েই ছবি আঁকে। আমি তাকে বললাম: ‘আরে মিয়া, মিডিয়াম কোনো ব্যাপার না, তুমি মানুষের রক্ত দিয়া আঁকো, কিংবা মুরগির রক্ত দিয়া, ছবির প্রথম শর্ত হচ্ছে, সেটা ছবি হতে হবে।’

স্পেনে ছিলাম অনেক দিন, রাজধানী মাদ্রিদে। মাদ্রিদে শুধু না, স্পেনের সব জায়গাতেই ছিলাম। স্পেন খুব সুন্দর দেশ, সব আছে। ইওরোপে মুসলিম সভ্যতা, সেটাতো স্পেনেই। ওখানেইতো আরব সভ্যতা শেষ অবধি টিকে ছিল। আলহামরা প্রাসাদের নাম শুনেছো না। কর্ডোভা, সেভিঈ এগুলো আরব সভ্যতার শহর, স্পেনেই সব। স্পেনের শিল্পীদের নামটাম মনে আছে? আরে খোদ পিকাসোই তো স্পেনের। গোইয়া, দালিও স্পেনের লোক।

কুড়ি বছর কোনো প্রদর্শনী করিনি। বয়স আশি হয়ে গেছে। আর প্রদর্শনী করবো না, ঠিক করেছি। প্রদর্শনী করতেই হবে, এমন কোনো কথা নেই। ছবি বেচতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। ভালো ছবি খুব কমই বিক্রি হয়, খারাপ ছবিই বিক্রি হয় বেশি। ভ্যানগগের একটা ছবি বিক্রি হয়েছিল, তাও সেটা কিনেছিল তার আপন ভাই। শিল্পী ভ্যানগগ না খেয়ে মরেছেন, আর এখন ভ্যানগগের একটা ছবিও যদি কারও কাছে থাকে, তার চৌদ্দপুরুষ পায়ের উপর পা তুলে খেয়ে যেতে পারবে।

এই যে শিল্পপ্রতিযোগিতা, ভুয়া একটা জিনিষ। একবার সারা পৃথিবীর পাঁচ হাজার ছবির মধ্যে বেছে একটা ছবিকে পুরষ্কার দিতে হবে। হ্যাঁ, পাঁচ হাজার ছবি, সোজা কথা নয়। আমি সেই প্রতিযোগিতার অন্যতম বিচারক। এটা কোনো বিচারের জাত হলো? তারপরও আমরা বিচার করলাম। একটা ছবিকে মনোনীত করলো সবাই, সর্বসম্মতিক্রমে। আলবেনিয়ার এক মেয়ে এঁকেছে, সেই ছবি সব বিচারকের চোখে লেগে গেলো। সবাই বললো, খুঁজে দেখো, এই শিল্পী আর কী কী করেছে জীবনে। খবর নিয়া দেখা গেলো, ঐ মেয়ে আর কোনো ছবিই আঁকেনি, এটাই তার প্রথম ছবি, হয়তো এটাই শেষ। সবাই বললো: ‘না এই শিল্পীকে পুরষ্কার দেওয়া যাবে না। এরতো কোনো ব্যাকগ্রাউন্ড, কোনো লেখাপড়া নাই।’ আমি সহমত হতে পারলাম না। ‘ঘোড়দৌঁড়ে একটা ঘোড়া প্রথম হয়েছে, সেই ঘোড়া ঘাস খেয়েছিল, না ছোলা খেয়েছিল, কোন মাঠের ঘাস খেয়েছিল, এইসব বিবেচ্য নয়।’ এ রকম হতে পারে। অনেক শিক্ষিত শিল্পীর আঁকা ছবির দেখতে দেখতে ত্যক্তবিরক্ত চোখে একজন অশিক্ষিত শিল্পীর ছবি এভাবে সবার ভালো লেগে যেতে পারে।

ফজলে হাসান আবেদের বামে মনির, ডানে মনিরপুত্র আরমান। ২০১৩ সালে তোলা ছবি।

ফজলে হাসান আবেদের বামে মনির, ডানে মনিরপুত্র আরমান। ২০১৩ সালে তোলা ছবি।

কী আঁকবে, সেটা কোনো প্রশ্ন নয়। যা আঁকতে ভালো লাগে, তাই আঁকো। ফিগারেটিভ আঁকতে ভালো লাগে, আঁকো। পোট্রেট, ল্যান্ডস্কেপ সব আঁকতে পারো। তবে বাবারা, আঁকটা শিখতে হবে। রেখাটা ঠিকমতো টানতে শিখতে হবে, রঙটা লাগাতে জানতে হবে। জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান এদের আসলে ভালো পোট্রেট শিল্পী হবার শখ ছিল, রেমব্রান্ডের মতো। এই দেশে তেমন শিল্পী নাই। নিজের কাজটা ভালো করে জানতে হবে। ছবি আঁকা যখন শুরু করি, আমরাতো জানতামই আগে কে কী এঁকেছে। এখনকার ছেলেমেয়েরাতো মোবাইল টিপলেই সব পাইয়া যায়। তোমাদের সমস্যা হচ্ছে, যেখানে শেষ করার কথা, সেখানে তোমরা শুরু করে। আরে বুঝলে না, আগে অ-আ-ক-খ শিখতে হবে, তারপর তো লিখতে শিখবে।

ছবিতে বোঝার কিছু নেই। আমাকে বলো, এই ছবি তোমার ভালো লাগছে কি লাগছে না। কে এঁকেছে, কীভাবে এঁকেছে, সেটা ব্যাপার নয়। শিল্প বোঝার নয়, ভালো লাগার ব্যাপার। বাংলাদেশেতো ‘শিল্পসমালোচনা’ বলে কিছু নেই। এখানে ‘শিল্প-প্রশংসা’ আছে। মন খুলে তুমি এখানে কথা বলতে পারবে না। বাংলাদেশ একটা ছোট দেশ, সবাই সবাইকে চেনে এখানে। তুমি হয়তো লিখলে, অঙ্কনের কলাকৌশল শিল্পী ঠিকঠাকমতো রপ্ত করতে পারেনি। ব্যস, তোমার সঙ্গে কথা বলা, এমনকি মুখদেখাদেখি বন্ধ। এসে তোমাকে দুই ঘা মেরেও যেতে পারে। এই পরিবেশে শিল্পসমালোচনা কী করে তুমি আশা করো?

যেখানেই যাবে বাংলাদেশে, ঢাকা মিউজিয়ামের কথাই ধরো না, দম বন্ধ হয়ে আসে। চারুকলার টয়লেটে, বাপরে, কী যে গন্ধ! আরে, টয়লেট সাফ রাখা বিদেশের চেয়ে বাংলাদেশে অনেক সহজ। একটা ঝাঁটা আর ফিনাইল পাইলে আর কি লাগে? আমার টয়লেটতো আমিই সাফ রাখি। ঢাকা মিউজিয়াম, চারুকলায় এমন একটা জায়গা নেই, যেখানে বসে দুই দণ্ড আড্ডা দেওয়া যায়। কী একটা সমাজ, কী একটা বিশ্রী পরিবেশ! এই যে আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে এসেছি, এখানে তোমার সঙ্গে বসে একটু কথা বলতে পারছি সাধারণ চা-কফি খেয়ে, এমন জায়গা বাংলাদেশে, ঢাকা শহরে নেই কেন?

আপনার কথাগুলো লিখে রাখবো কি? ‘ধুর মিয়া, বাদ দাও! কী অইব লেইখা? হোনো, জন্মদিন আছিল কদিন আগে। লোকজন এক গাদা ফুল নিয়া আইছিল। এত ফুল দিয়া করুম কী? আরে ভাই, দুই একটা ‘ফুলকপি’ নিয়া আইতি, এট্টু ঝোল রাঁইধা খাইতাম।’

তুমি কই থাকো কইলা? নিউমার্কেট? হায়! আগের সেই নিউমার্কেট কি আছে? বাংলাদেশের মানুষতো সব এনার্কিস্ট অইয়া গেছে। দোকানের বাইরের ফুটপাত দোকানদারের দখলে। ফুটপাতে একটা চৌকি, একটা ফ্রিজ বসাইয়া রাখছে, দোকানের মালামাল রাইখা দিছে। তুমি হাঁটবা কোন দিক দিয়া?

অসভ্য দেশ একটা। কেউ দেখার নাই। পঞ্চাশ-ষাইটের দশকে নূরুল আমিনে বানাইছিল এই নিউমার্কেট। কী যে সুন্দর আছিল, সবুজ আর সবুজ। ভদ্রলোকেরা ফ্যামিলি লইয়া বিকাল বেলায় হাঁটতে আসতো। সব হাইক্লাস লোকজন। আর এখন? আমারতো সব নিজের চোখে দেখা। চারুকলার শাহনেওয়াজ হলে দুই বছর থাকছি না। তারপরতো চইলা গেলাম স্পেনে।

বিরাশি বছর বয়স চলতাছে। এই বয়সে আইসা মনে অয়, সব নিয়তি, একটা ডেসটিনি। ছোট্ট একটা ঘটনা কীভাবে একটা জীবন, পুরা ঘটনা প্রবাহ বদলে দিতে পারে, ভাবা যায় না। রফিকুন্নবী আর আমি এক বয়সী। দেশ স্বাধীনের আগের কথা। বিদেশ থেকে যে স্কলারশিপ আসতো পশ্চিম পাকিস্তানিরা সব নিজেদের জন্য রেখে দিতো। ডেইটলাইনের সপ্তাহ খানেক আগে দুই একটা স্কলারশিপের বিজ্ঞাপন দিত পূর্ব পাকিস্তানে। আরে কাগজপত্র যোগাড় করতেইতো দুই মাস লাইগা যায়। এর ফলে হতো কী, বাঙালিরা বিদেশে যেতেই পারতো না। পাসপোর্টের ক্লিয়ারেন্স আসতো করাচি-ইসলামাবাদ থেকে। আমাদের পাসপোর্টই করতে দিত না।

একদিন চারুকলার করিডোরে হাঁটতাছি। রফিকুন্নবীয়ে কয়: ‘কী মনীর, স্পেন যাইবা?’ সেই সময় বিদেশ যাওয়া ছিল স্বপ্নের মতো। সব কাগজপত্র যোগাড় করতে পারি নাই, যতটুক পারছি, ততটুকই জমা দিয়া দরখাস্ত কইরা দিলাম। কীভাবে জানি, স্কলারশিপও অইয়া গেলো। সেই যে গেলাম, থাইকা গেলাম পঞ্চাশ বছর।

আমি যখন স্পেন যাই, তখন ফ্রাঙ্কোর আমলের শেষ দিক। ফ্রাঙ্কোর আমল বছর পাঁচেক পেয়েছি। স্বৈরাচারী ছিল, অনেক কাজ খারাপ করেছে, তবে কিছু ভালোও করেছে। একটা ভালো কাজ ছিল এই যে স্পেনকে সে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জড়াতে দেয়নি। হিটলার তার বন্ধু ছিল, হিটলার ফ্রাঙ্কোকে বলেছিল, স্পেনের ভিতর দিয়ে সৈন্য নিয়ে গিয়ে সে মরক্কো দখল করতে চায়। ফ্রাঙ্কো রাজি হয়নি। রাজি হলে স্পেনের অবস্থা আজকের রুমানিয়া বা বুলগেরিয়ার মতো হতো।

স্পেন দারুণ একটা দেশ। লোকগুলোও চমৎকার। আমি যখন যাই, তখনও স্পেন গরীব, আমাদের দেশের চেয়েও হয়তো গরীব। যত পুরষ্কার আছে, সব আমারে তারা দিছে। বাংলাদেশও যত পুরস্কার আছে, সব দিয়েছে। কিন্তু পুরষ্কার দিয়ে হবে কী? কে মনে রাখে পুরষ্কারের কথা। এই যেমন ধরো, আমি একুশে পুরষ্কার পেয়েছি। আমি কি বিমানবন্দরে ভিআইপি রুমে বসতে পারি? বেশি কিছুতো না, কয়েক ঘণ্টা বিশ্রাম নেবো। না, আমলারা দেখি সব চেগাইয়া বইসা আছে। পুলিশ আমারে ঢুকতে দেয় না। মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূররে কইলাম: ‘কী মিয়া এত বড় একটা জাতীয় পুরষ্কার দিলা, কিন্তু ভিআইপি রুমে তো প্রবেশাধিকার দিলা না। আমরাতো আর কিছু চাই না, এট্টু সম্মান চাই।’ হ্যায় কয়, দেখি কী করা যায়? কী আর করবে সে? এই দেশে শিল্পী-বুদ্ধিজীবীগো সম্মান নাই। সব সম্মান আমলা-মন্ত্রীদের।

বয়স একটা ফ্যাক্টর। হাজার কাজ পড়ে আছে, শরীরে শক্তি পাই না। সারা দিন রোজা ছিলাম, এখন তারাবিটা পড়ার পরেই শরীর ছেড়ে দেবে। সেহরি খাইয়া ঘুমাইতে ঘুমাইতে সকাল ছয়টা। একটু চোখে লেগে আসতেই শুরু হয়ে যায় রাস্তার হৈচৈ, রিকশার টুংটাং,গাড়ির হর্ন, কনস্ট্রাকশনের আওয়াজ, ঢাকা শহরের কাউয়াও কি কম বিরক্ত করে? এই শহরে শান্তিতে ঘুমানোর উপায় নাই।

অভ্যাস একটা শ্যাওলার মতো, পাথরের উপর জমতেই থাকে এবং এই শ্যাওলাতে পা পিছলাইয়া মাইনসের পা ভাঙে। কত টাকা লাগে মানুষের? কিন্তু কখনও শুনেছো, কেউ বলেছে, আমার আর টাকার দরকার নাই। আমি অনেক দুই নম্বরি করেছি, আর করবো না। এগুলোও অভ্যাস। দুনীর্তি, অর্থলোভ এইগুলা সব অভ্যাস।

অনেক শিল্পী দেখবা, সারা জীবন একই ছবি আঁকতাছে। বছরের পর বছর তার কাজে কোনো পরিবর্তন নাই। রিক্স নিয়া নতুন কিছু যে করবো, সেই সাহস নাই। এর কারণ কি? অভ্যাসের শ্যাওলায় সে আটকাইয়া গেছে। শ্যাওলায় পা মচকাইয়া পঙ্গু হয়ে সে পড়ে আছে, নতুন করে, নতুন পথে হাঁটতে পারছে না, হাঁটার সাহস করছে না। আমাদের দেশের বড় বড় শিল্পীরা পয়সার জন্য ফালতু সব ছবি আঁকে। এই সব ছবি ব্যাংক, বিমানবন্দরের দেওয়ালে ঝুলে, দেখছ না? অনেকেই এই কাম করে, নাম কমু না, বিখ্যাত লোক সব, আমারই বন্ধুবান্ধব।

ডক্টর ইউনূস আর আবেদ সাহেব দুই জনকেই আমি কাছ থেকে দেখেছি। দুই জনরেই আমি গাড়িতে কইরা স্পেন ঘুরাইছি। আমরাতো ভিতরের খবর জানি না, তবে ডক্টর ইউনুস স্পেনে খুবই পরিচিত। দুই পা যাওয়ার আগেই রাস্তায় একজন এসে ওনার সঙ্গে ছবি তুলতে চায়। আমাদের কোনো রাজনীতিবিদই ওনার মতো পরিচিত না বিদেশে।

একবার স্পেনের রাণীর সঙ্গে দেখা করতে গেছি ইউনুসরে নিয়া। রাণী সোফিয়া চমৎকার মহিলা। যাই হোক, ওনারা কথা বলতেছেন আর আমি বাইরে বইসা সিগারেট টানতাছি। দুই বুড়ি, দুই জনই বড় দুই ব্যাংকের মালিক, আমার কাছে আইসা আমার সঙ্গে আলাপ করতে চাইল। হ্যারা ভাবছে, আমিই ডক্টর ইউনুস। আমি যতই বলি, আমি ইউনুস না, আমি একজন শিল্পী, ছবিটবি আঁকি, বিশ্বাসই করে না। ‘ও আপনি ছবিও আঁকেন, আমরাতো আপনার এই গুণটির কথা জানতাম না!’

আবেদ সাহেব আর ডক্টর ইউনুস দুই জন দুই রকম মানুষ। ইউনুস একটু বেশি ক্যারিশম্যাটিক, খুব ভালো করে, গুছিয়ে কথা বলতে পারেন। রাজনীতির মারপ্যাঁচতো বুঝি না, তবে একজন নোবেল লরিয়েটকে এতটা কষ্ট না দিলেও হয়তো চলতো।

শিল্প-সাহিত্যে ইউনুসের তেমন আগ্রহ দেখিনি, তবে আবেদ সাহেবের বেশ আগ্রহ ছিল এসব বিষয়ে। ব্র্যাক বিশ্বের এক নম্বর এনজিও এবং একে রাজনীতি থেকে মুক্ত রাখাটা সোজা কাজ ছিল না। আবেদ সাহেব এই কাজটি সফলতার সঙ্গে করতে পেরেছেন। ‘সবতো পেলেন জীবনে। নোবেলটা যে বাকি রয়ে গেলো!’ আবেদ সাহেব মুচকি হেসে উত্তর দিয়েছিলেন: ‘একজনে নোবেল পাইয়া কী আরামে আছে দেখতাছেন না?’

আরে তোমার কথাতো কিছুই জিগাইলাম না। কোথায় লেখাপড়া করছো কইলা? প্যারিসে? কী পড়ছো? ইন্ডোলজি আর লিঙ্গুইস্টিক্স? রেয়ার সাবজেক্ট। বেশি লোকতো এই সবের চর্চা করে না আমাগো দেশে। কত বছর আছিলা প্যারিসে? দঅশ বছর? চইলা আইলা ক্যান মিয়া? ভালা লাগে নাই? আমিতো ফিরতেই পারি নাই বহু বছর। কী কইলা, আমার মতন স্পেনপ্রবাসী এক শিল্পী চরিত্র আছে একটা হিন্দি ছবিতে? কী ছবি কইলা, জিন্দেগী না মিলে দোবারা?

এই দেশের কিছু সুবিধাতো আছেই। দুইটা কাজের লোক, একটা ড্রাইভার এখনও রাখা যায়। বিদেশে, ফ্রান্সে এসব তুমি কল্পনা করতে পারবা? স্পেনে আমার যে বাড়ি, ঠিকানা লাগবে না, চোখ বন্ধ করে চলে যেতে পারবে, মেয়র অফিসের ঠিক পাশেই। ছয়-সাত মিলিয়ন ডলার নাকি দাম। ছবিও অনেক বিক্রি অয়। কিন্তু কী লাভ? কিছুইতো সঙ্গে যাইবো না। আইছি খালি হাতে, যামুও খালি হাতে। গত ষাইট বছর ছবি আঁকন ছাড়া অন্য কোনো কাম করি নাই। ছবি আঁইকা যে বাঁইচা আছি — এইটাইতো আমার অবাক লাগে।

আমার বহু ছবি বিক্রি অইয়া গেছে, কিন্তু ঐ সব ছবি অহনও আঁকা অয় নাই। দাদন দিয়া গেছে বড়লোকেরা। এই সব ছবি আঁকনের কথা মনে অইলেই গায়ে জ্বর আসে। আমি যেই সব ছবি আঁকবার চাই, যেই সব ছবি আঁকতে আমার ভালো লাগে, সেই সব ছবি বিক্রি হয় না। ধরো, একটা ছবি এক জন পছন্দ করলো, তখনও আঁকা শেষ হয় নাই। আমি নতুন কিছু কাজ করলাম ছবিটাতে, কাস্টমার বলে কী, দিলেনতো ছবিটা নষ্ট কইরা! আগেইতো ভালা আছিল! কাস্টমারের রুচির সঙ্গে আমার রুচি মেলে না। এই জন্যেই ফরমায়েশি ছবি আঁকতে ভালো লাগে না। ঠিকই কইছো, দাভিঞ্চিরও এই সমস্যা আছিল। ঠিক ঠিক, তোমার কথা ঠিক, ‘মোনালিসা’, ‘লাস্ট সাপার’ সবইতো ফরমায়েশি ছবি।

আলিয়ঁসের এই গ্যালারিটায় বেশ স্পেস আছে। ভালো, বেশ ভালো পরিবেশ। মামুন ছেলেটাও বেশ করিৎকর্মা আর সিরিয়াস। আরে মিয়া এপার্টমেন্ট হাউজের নিচ তলায় কিছু রুম নিয়া ছবি টাঙাইয়া দিলেই গ্যালারি অইয়া যায় না। এপার্টমেন্টের গন্ধটা থাইকাই যায়। গ্যালারি অইতে গেলে একটা মেজাজ লাগে। ঢাকা শহরে ছবির গ্যালারি বাড়তাছে। এই সপ্তাহেইতো নতুন কয়েকটা গ্যালারি উদ্বোধন অইলো। যত বাড়ে ততই ভালো।

সুরঞ্জনার একজিবিশন কবে কইলা, এপ্রিলের উনিশ তারিখ? কোথায় হবে? এই গ্যালারিতে? কী কাজ করে সে? স্টিচড কোলাজ? ভালো, খুব ভালো। ঢাকায় থাকলে, সুস্থ থাকলে অবশ্যই আসবো, তবে কথা দিতে পারছি না। এই সপ্তাহেই দুইটা একজিবিশনে উদ্বোধনের দিন থাকবো কথা দিয়েও উপস্থিত থাকতে পারি নাই। আজকাল শরীর পারমিট করে না।

হাজার হাজার ছবি আঁকছি, বুঝছো? এই সব ছবি সংরক্ষণের চিন্তাও করি না। সময় নাই, শক্তিও নাই। ছবি আঁইকা আনন্দ পাই, ছবি আঁকি। আমরাতো সবাই নিজেদের অমর ভাবতে ভালোবাসি। অনেকে পুনর্জন্মেও বিশ্বাস করে হয়তো। কিন্তু আগে পরে কিছুই থাকবে না। জয়নুল আবেদিনের ছবি মিউজিয়ামে রাখছে। কয়দিন রাখবে? মিউজিয়ামও একদিন নষ্ট হবে, খসে খসে পড়বে ইটাবালি।

আমারে বিদায় দেওনের লাইগা আমার পিছে পিছে আহনের দরকার নাই। আমার সময় শেষ, আমি যাইগা। তুমি ভিতরে থাকো, বন্ধুদের সময় দাও!

 

You may also like

প্রকাশক : জিয়াউল হায়দার তুহিন

সম্পাদক : হামীম কেফায়েত

গ্রেটার ঢাকা পাবলিকেশন
নিউমার্কেট সিটি কমপ্লেক্স
৪৪/১, রহিম স্কয়ার, নিউমার্কেট, ঢাকা ১২০৫

যোগাযোগ : +8801712813999

ইমেইল : news@dhakabarta.net