শনিবার (১০ জানুয়ারি) সাংবাদিকদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বেলা সোয়া ১১টায় রাজধানীর বনানীর হোটেল শেরাটনের গ্র্যান্ড বলরুমে এই অনুষ্ঠান শুরু হয়। এতে নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীরসহ দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমের সম্পাদক ও সাংবাদিকরা বক্তব্য দেন। নিচে নূরুল কবীরের পুরো বক্তব্য দেওয়া হল। ভিডিও থেকে ট্রান্সক্রিপ্ট করেছেন অলি আমিন।
জাতীয়তাবাদী দলের সম্মানিত চেয়ারম্যান, সাধারণ সম্পাদক এবং সামনে উপবিষ্ট সাংবাদিক সহকর্মীবৃন্দ। আমাকে শুভেচ্ছা বিনিময়ের বক্তব্য দিতে অনুরোধ করেছেন। একটা হচ্ছে ব্যক্তিগত শুভেচ্ছা, কতক্ষণ আগে আমরা সেটা বিনিময় করেছি। একজন রাজনীতিকের জন্যে ঠিক কী শুভেচ্ছা চায়, সেটা খুব পরিষ্কার করে বললে ভালো হয়। সুতরাং এই মুহূর্তের তাঁর জন্য আমার যে শুভেচ্ছা, সেটা পুরোটাই রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং মিডিয়ার দিক থেকে কী করলে বাংলাদেশের সমাজ এবং রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক বিকাশের সহযোগিতা হতে পারে, সে সেগুলো যাতে করতে পারেন, সেই শুভেচ্ছা আমি ওনাকে জানাবো খুব সংক্ষেপে।

নূরুল কবীরের বক্তব্য গভীর মনোযোগে শুনছেন তারেক রহমান ও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
আমরা আজকে এই মুহূর্তে এমন একটা সময়ে এখানে সবাই সমবেত হয়েছি, যখন একটা পুরনো, ভীষণভাবে স্বৈরতান্ত্রিক একটা ব্যবস্থা, একটা বড় ধরনের শিক্ষার্থী গণঅভ্যুত্থানের মুখে পতন ঘটেছে। কিন্তু এটার পরিবর্তে যেই জন্যে মানুষের এই আত্মদান, সেই আত্মদানের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা যে আকাঙ্ক্ষা, সেই আকাঙ্ক্ষা বাংলাদেশ গড়ে ওঠবার প্রক্রিয়ার মধ্যে আছি আমরা। কিন্তু সেটা এখনও গড়ে উঠে নাই। এই কারণেই এটা একটা উত্তরণের সময়, একটা অন্তর্বর্তী সময়, খুবই অস্থির একটা সময়।
এই সময়ের মধ্যে একদিকে যেমন পেছনের দিকে তাকিয়ে আমরা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য আত্মদান দেখি, অন্যদিকে ভবিষ্যতের এই আত্মদানের জন্যে আত্মদানের মাধ্যমে যে যে আকাঙ্ক্ষা সমাজে মূর্ত হয়েছিল, সেগুলো কী পদ্ধতিতে বাস্তবায়ন করা সম্ভব, সেগুলো আলোচনা এই সময়ে বেশি হওয়া দরকার। নইলে মাত্র তিন সপ্তাহ সময়ের মধ্যে একটা স্বাধীন দেশে প্রায় ১৫০০ নারী, পুরুষ, তরুণ-তরুণী, শিশুর মৃত্যু, ২০ হাজারের মতন তরুণদের ইনজুড হয়ে যাওয়া, তার মধ্যে প্রায় ৭০০-৮০০ সারাজীবন ধরে না দেখবার অবস্থায় তৈরি হয়েছে, তাদের চোখের আলো হারিয়েছেন, এই সমস্ত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গিয়েছি বলে আজকে তারেক রহমান সাহেব এখানে উপস্থিত হতে পেরেছেন। সেখানে তাদের অবদান আছে। অন্য সবার অবদান আছে। এই গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে আমরা রাজনীতির, সংস্কৃতির নানা ধরনের প্রবণতা দেখেছি। এটার মধ্যে ডান, বাম, মধ্যবর্তী রাজনৈতিক ধারা সক্রিয় ছিল। আবার এগুলোর সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত নন, সাধারণভাবে একটা শান্তিপূর্ণ সামাজিক, রাজনৈতিক ব্যবস্থা দেখতে চান এমন লক্ষ লক্ষ মানুষ ছিল, তাদের আত্মদান আছে।
এই সময়টা, এই উত্তরণকালীন সময়টায় পরস্পরকে দোষারোপ না করে, বরং এই আত্মদানকে কী করে একটা রাজনৈতিকভাবে, সামাজিকভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার দিকে এগোনো যায়, সে আলোচনাগুলি হলে আমার মনে হয় আমাদের সময়ের প্রতি, এই উত্তরণকালীন সময়ের প্রতি সুবিচার করা হবে।
দ্বিতীয়, খুব সংক্ষিপ্তভাবে একটা প্রশ্ন রেখে যেতে চাই আপনাদের সামনে এবং এটা ওই শুভেচ্ছা হিসেবে অনুরোধ করব। পৃথিবীতে এমন কোন জায়গায় কখনোই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় নাই, যেখানে গণমাধ্যমের আইনগত, রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা ছিল না। ফলে গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম আর মিডিয়ার যে গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা, এই দুইটা হাত ধরাধরি করে চলেছে। আমরা যদি ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে, সমাজ এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তর চাই, অবশ্যই গণতান্ত্রিক রাজনীতির পাশাপাশি একটা গণতান্ত্রিক সাংবাদিকতার পরিবেশ থাকতে হবে। কোন রাজনৈতিক দল যদি বিশ্বাস করে, মানুষকে যদি বলেন যে তারা গণতান্ত্রিক রূপান্তর চান, তাহলে একই সঙ্গে তার দায় দাঁড়ায় সেই গণতান্ত্রিক রূপান্তরে সহযোগিতা করবার জন্যই গণতান্ত্রিক সাংবাদিকতার পরিবেশ নিশ্চিত করা। সেগুলো কী কী পদ্ধতিতে গণতান্ত্রিক সাংবাদিকতার আবহ নষ্ট হয়, সেগুলো আলোচনার জন্য তো সেমিনার করা যেতে পারে। আমি শুধু এইটুকু শুভেচ্ছা জানিয়ে রাখবো যে, এটা, আপনারা যেন সেই পরিস্থিতি তৈরি করতে পারেন।
শেষ কথা আমি বলতে চাই, আপনি নিজেরা শুনেছেন, কিছুক্ষণ আগে আমার একজন সহকর্মীও বলে গেছেন। বাংলাদেশে অতীতের সময়ে বহু সংবাদকর্মীর ওপর, বহু সাংবাদিকের ওপর নানাভাবে মামলা-হামলা, অন্যায় হয়েছে। সেই সব মামলায় আইনগতভাবে লড়াই করবার পরিবেশটাও উপস্থিত ছিল না। আমি বলব এই মুহূর্তও গত রেজিমের সঙ্গে যারা সমর্থক ছিলেন, তাদের অনেকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, জেলে আছেন। ওই শেখ হাসিনার আমলের ওইগুলি যদি অন্যায় হয়ে থাকে, এবং তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও যদি ন্যায়ভাবে, আইনগতভাবে তাদেরকে মামলা লড়ার সুযোগ না দেওয়া যদি অন্যায় হয়ে থাকে, সেই অন্যায়কে আর একটা ন্যায় দিয়েই আমরা বিগত অন্যায়টাকে আরো প্রতিষ্ঠিত দেখাতে পারি। এই সময়ে যারা জেলের মধ্যে আছেন, ভিন্নমতের জন্যে, তারা যা যা করেছেন, সেইটা আমরা বিশ্বাস করি না বলেই এখানে মুক্ত আছি। কিন্তু তাদের যা আইনসম্মত অধিকার আছে, অভিযুক্ত হিসেবেই যে আইনসম্মত অধিকার আছে, সেইগুলো নিশ্চিত করবার জন্য সংবাদপত্রের পক্ষ থেকে আমাদের এই এডিটরস কাউন্সিলের পক্ষ থেকে আমরা বিভিন্ন সময়ে সরকারকে বলেছি। সরকার বলেছে তারা সেটা দেখবেন। যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট মামলা আছে তাদের বিচার প্রক্রিয়ার মধ্যে শাস্তি হোক, এটা আমরা চাই। সরকার বলেছে তারা এটা দেখবেন। কিন্তু তাদের আইনগত অধিকারগুলি নিশ্চিত করবার কথা দিয়েও তারা রাখেননি। আমি আপনাকে এই জন্য শুভেচ্ছা জানাবার চেষ্টা করবো যে আপনার যতটুকু প্রভাব এই মুহূর্তে আছে, সেই প্রভাব খাটিয়ে যদি বিগত সরকারের আমলের যে অন্যায়গুলো হয়েছে, সে অন্যায়ের রিপিটেশন যদি আমরা বন্ধ করতে না পারি, তাহলে ন্যায়সংগত রাষ্ট্রের তরফ থেকে সংবাদপত্র এবং মিডিয়াকর্মীদের প্রতি ন্যায়সংগত আচরণের উদাহরণ আমরা তৈরি করতে পারবো না। ফলে এই ব্যাপারে যদি আপনার কোন প্রভাব থাকে, আপনি ক্ষমতায় যাবার জন্য অপেক্ষা না করে এইটা ব্যবস্থা করতে পারার তৌফিক আপনার হোক সেই শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করছি।
সবশেষে আমি বলবো গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা, সংবাদ মাধ্যমের মানে হচ্ছে পাওয়ার, যেটাকে বলে যে ক্ষমতার সঙ্গে গণতান্ত্রিক সাংবাদিকতার সম্পর্ক নিরন্তরভাবে এক ধরনের পেশাগত বৈরিতা দিয়েই চিহ্নিত থাকে। সেটা কোন ব্যক্তিগত নয়। সেটা কোন দলের বিরুদ্ধে বা কোন দলের পক্ষের ব্যাপার নয়।
এটা সত্য যে পুরনো আমলগুলি, বিভিন্ন রাজনৈতিক আমলগুলি যদি আমরা লক্ষ্য করি, সেখানে স্বীকার করতে হবে যে বিএনপি আমলে আওয়ামী লীগ আমলের তুলনায় অনেক বেশি সহনশীলতা আমরা লক্ষ্য করেছি। কিন্তু আমি মনে করি, ২৪ সালের ৫ই আগস্টের (পূর্বের) পেছনে বাংলাদেশ আর কোনদিন ফেরত যাবে না। এইটা দুই পক্ষই বুঝলে আমাদের সম্পর্কটা ভালো হবে এবং গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক সাংবাদিকতার পথ উন্মুক্ত হবে। কোন অবস্থাতেই কোন রাজনৈতিক দল যদি আমি বিশ্বাস করি, আমার যদি সামান্যতম ইতিহাস বোধ থেকে থাকে, ৫ই আগস্টের আগ পর্যন্ত বিভিন্ন রেজিম, যেভাবে সরকার চালিয়েছে বা সংবাদপত্রগুলোও যেভাবে ব্যবহার করেছে, সেইটা দিন শেষ হয়ে গেছে। এ কারণে যে, একটা বড় ধরনের গণঅভ্যুত্থান সমস্ত সমাজব্যাপী তার গভীরতা নিয়ে মানুষের চৈতন্য এবং মননকে যেভাবে আন্দোলিত করে, বিকশিত করে, রাজনৈতিকভাবে যে নতুন আকাঙ্ক্ষার জন্ম দেয়, সেইটা একটা চাপ আকারে সমাজের সর্বত্র, রাষ্ট্রের সর্বত্র জারি থাকবে বলে আমার ধারণা। ফলে সেগুলোকে দমন না করে সেগুলোকে বরং সম্মান জানিয়ে গোটা সংবাদ মাধ্যমের ক্ষমতাকে গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার মধ্যে আনবার যে দায়িত্ব, সেই দায়িত্ব পালনে আপনারা যদি ক্ষমতায় যান কিংবা ক্ষমতায় না গিয়েও সমাজে আপনারা প্রভাবশালী সংগঠন হিসেবেও যদি থাকেন, সেইটা যাতে আপনারা অনুমোদন করতে পারেন, সেই সহনশীলতা আপনাদের হোক, সেই শুভেচ্ছা আপনাকে জ্ঞাপন করছি। আপনাকে ধন্যবাদ।
