বৃহস্পতিবার, জুলাই ২৫, ২০২৪

ফেসবুকে পড়ে থাকা পাঠকও জীবনানন্দ বুঝতেছে —হাসান রোবায়েত

by ঢাকাবার্তা
হাসান রোবায়েত

প্রশ্ন : কেমন আছেন?
হাসান রোবায়েত : ভালো, আপনি কেমন আছেন?

হ্যা, ভালো আছি আমিও, আপনার বই পড়ে আসলাম কিছুটা।
কোনটা? “মীনগন্ধের তারা”?

হ্যা, হ্যা, “মীনগন্ধের তারা”, এই বইয়ের এই নাম কেন?
আসলে আমি চাইলে আপনাকে এখন এই নামকরণ সম্পর্কে অনেক গল্প বলতে পারি। কিন্তু আসলে কোন গল্প নেই বিশেষ, এই বইতে একটা কবিতার একটা লাইন ছিলো,
“একটা হারিকেনের ভেতর আস্ত গ্রাম
ডুবে যাচ্ছে ধীরে
তখনো ছায়ায় কাঁপে মীনগন্ধের তারা”
এই লাইন থেকে আমার মীনগন্ধের তারা কথাটা ভাল লেগেছে সেটাই নাম হিসেবে ব্যবহার করেছি।

শিরোনাম হিসেবে আপনার কাছে নামটা পুরো বইকে তুলে ধরে কি?
না করে না তো, করবে কীভাবে? একটা লাইন থেকে কয়েকটা শব্দ নিয়ে নিয়েছি সেই শব্দগুলো কীভাবে আমার পুরো বইকে প্রেজেন্ট করবে? আর আমি এরকমভাবে করতে চাইওনি, আমার সেরকম কোন চেষ্টা থাকেও না যে একটা নাম পুরো বইয়ের ফিলোসোফিকে ধারণ করবে! মূলত এস্থেটিক্সের সৌন্দর্যকে গুরুত্ব দিয়েই নাম ঠিক করি, আমার যে বই সেই বইয়ের নামটা যেন শুনতে ভালো লাগে এই চিন্তাটাই কেবল করি বইয়ের নামের ক্ষেত্রে। প্রচ্ছদের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। দেখবেন যে প্রচ্ছদে একটা পাখি আছে, কিন্তু বইয়ের নাম “মীনগন্ধের তারা”। অর্থ্যাৎ কোথায় মাছ কোথায় পাখি! আমার মনে হয় প্রচ্ছদ একটা আলাদা শিল্পের জায়গা সেটার সৌন্দর্যের আলাদা মূল্য।

প্রচ্ছদ কি শিল্পী বইয়ের বিষয়ে না জেনেই করেন?
আমার বইয়ের এখন যে প্রচ্ছদ সেই প্রচ্ছদ রাজীব দা করেছে অন্য একটা পাণ্ডুলিপির জন্য, কিন্তু পরে দেখলাম প্রচ্ছদটা খুব সুন্দর, আমি এই বইয়ের জন্যই সেটা নিয়ে নিয়েছি। রাজীব দা শুধু নাম বদলে দিয়েছেন।

আপনার মনে হয় না কোন সাযুজ্য থাকা দরকার প্রচ্ছদের সাথে বইয়ের ভেতরের অবস্থার?
নাহ! প্রচ্ছদের সাথে বইয়ের সাযুজ্য কেনো লাগবে? এটা একটা আলাদা শিল্প, একটা দুইহাজার পৃষ্ঠার বইয়ের প্রচ্ছদ যে করবে সে কি পুরো বইয়ের সারমর্ম উদ্ধার করে তারপর বইয়ের প্রচ্ছদ আঁকবে? আঁকবেনা কিন্তু। ওনারা কীভাবে করেন আমার ঠিক জানা নেই। হয়তো ফ্ল্যাপে কিছু লেখা থেকে ওই ধারণা থেকে লেখেন, কিন্তু প্রচ্ছদ একটা আলাদা শিল্প! এর বইয়ের বিষয়ের সাথে সাযুজ্য থাকা জরুরি না, বইটাকে একটা পোষাক পরিয়ে দেয়া কেবল! সেই পোষাকটা সুন্দর হলেই হয়! এটাই আমার মতে প্রচ্ছদের সাথে বইয়ের সম্পর্ক!

হাসান রোবায়েত

আপনার পড়াশোনা তো ম্যাথমেটিক্সে, লিখছেন কবিতা! দুইটা কি কোথাও সম্পর্কিত?
আসলে এগুলো সবই তো শিল্পের জায়গা! আপনি যেকারণে প্রশ্ন করেছেন সেটা হলো আমাদের দেশে গণিত, রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান এসব বিষয়কে চাকরির জন্য ভালো বিষয় হিসেবে দেখা হয়! মনে করা হয় এসব পড়লে দ্রুত ভালো চাকরি পাওয়া যাবে, কিন্তু হিউম্যান হিস্ট্রি তো তা না আসলে। আপনি যদি দেখে থাকেন এসব গবেষণার ইতিহাস, তারা কিন্তু কেবল চাকরির জন্য ম্যাথম্যাটিক্স প্রাকটিস করেনি, আমি কবিতা লিখে যেই শান্তি পাই, সেই শান্তির জায়গা থেকেই তারাও ম্যাথের চর্চা করেছেন। যিনি পিওর ম্যাথমেটিক্স চর্চা করেছেন তিনি এর ভেতরকার সৌন্দর্যটা উদঘাটনের জন্যই করেছেন। আমি কবিতা লিখি, এই আমি যখন সারাদিন নানারকম ঝামেলায় থাকি, নানা রকম খারাপ অবস্থার মধ্যে থাকি, রাত এগারোটার পরে যখনই কবিতা লিখতে বসি আমার সমস্ত খারাপ অবস্থার মধ্যে দিয়েও আমি চলে যাই এক শান্তির জগতে। এবং এই শান্তিটা রাত এগারোটার পর পাবো চিন্তা করে করে আমি সারাদিনের সমস্ত অস্থিরতা খারাপ অনুভূতিকে সহজে গ্রহণও করে ফেলি। আমার আশা থাকে একটা রিলিফ তো পাবোই, আমি তো ওই সময়টা ভালো থাকবোই। এইভাবেই ম্যাথম্যাটিশিয়ানরাও নিজেদের শান্তির জন্যই ম্যাথ চর্চা করেছেন, সেক্ষেত্রে শিল্পই হলো এমন একটা বিষয় যা আপনাকে অন্যরকম একটা ভালো সময় দেবে জীবনকে উপভোগ করার জন্য! তাই ম্যাথ আর কবিতা তো সংশ্লিষ্টই।

আপনার কবিতার ব্যাপারে অতিপ্রাকৃত ভাবনার একটা অভিযোগ আছে, সেটা সম্পর্কে শুনতে চাই…
অতিপ্রাকৃত বলে আসলে কিছু নেই। আমরা আসলে যে ধরণের এক্সপেরিয়েন্স আমাদের নেই সেটাকে সুপারন্যাচারাল বলে থাকি, কারণ এই বিষয়ের সঙ্গে আমাদের পরিচিতি নেই। জীবনানন্দের টেক্সট যখন লেখা হয়েছে তখনকার লোকেরা কিন্তু অনেক বেশি সাহিত্যঘেষা ছিলো, মা বোনেরা অবসর সময়ে বইই পড়তো, ফেসবুক বা অন্য কোন সুস্থ বিনোদন কম ছিলো। তখনকার এতো বিদগ্ধ পাঠকেরাও সেই জীবনানন্দকে বুঝতে পারেনি, কিন্তু এখনকার সারাক্ষণ ফেসবুকে পড়ে থাকা পাঠকও জীবনানন্দ বুঝতেছে। মূলত উনি যখন আনলেন বিষয়গুলো নতুন নতুন, তখন উটের গ্রীবার মতো নিস্তব্ধতা কেউ চিন্তাই করতে পারেনি। এজন্যই সকলের কাছে এগুলোকে এবসার্ড বলে মনে হয়েছে।

কিন্তু আমাদের পাশেই তো আপনি বা জীবনানন্দ বাস করতেন বা করছেন, তাহলে আমরা কেউ বুঝলাম না আপনি সেসব ধারণা অর্জন করলেন কোথায়?
আসলে এটা মানুষের জিনের মধ্যেই থেকে যায়। আমি একাই বুঝি এরকম কিন্তু না, আমাদের বংশ পরম্পরার ইতিহাস স্বরূপ আমরা এগুলো এচিভ করি। একটা সাপের বাচ্চা ডিমের ভেতর থেকে এইমাত্র বের হয়েই ওর শত্রু ইঁদুরকে শত্রু হিসেবেই চিনতে পারে। এগুলো মূলত ইভাল্যুশনের যে ব্যাপারটা হয় সেটার কারণে হাজার বছর ধরে যেকোনো প্রাণীর ডিএনএর মধ্যেই থেকে যায়! একটা বাচ্চাকে আপনি সাপ দিয়ে রাখেন সে এটা নিয়ে খেলবেনা! এমনকি নবী মুসাও কিন্তু তাকে পরীক্ষার জন্য আগুন এবং ফুল সামনে দিলে ফুলটাই নিতে চেয়েছে। পরে জিব্রাইল তাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আগুনে হাত নিয়ে দেন, হিউম্যান হিস্ট্রি অনুযায়ীই কিন্তু মুসার আচরণ ছিল। অর্থাৎ এগুলো কোথাও থেকে আজগুবিভাবে আসে না, এগুলো আমাদের মধ্যেই থাকে, কোনো কারণে সেটা পেয়ে যাই আমি আমরা কেউ কেউ।

হাসান রোবায়েত

আপনি কি আর ম্যাথ চর্চা করেন?
আমি তো ছাত্র পড়াই, টিউশন করি আরকি! ম্যাথম্যাটিক্সের ওই জায়গাটা আর নেই, আমাদের দেশে সবাই চাকরি পাওয়ার জন্য ম্যাথ পড়ে। সেক্ষেত্রে ম্যাথের চর্চা আর নেই। তবে আমি নিজে ম্যাথে পড়ে অনেক উপকৃত হয়েছি। কারণ ম্যাথে না পড়লে হয়তো আজকে আমি যেভাবে কবিতা লিখছি সেভাবে কবিতা লেখার বিষয়টা আমার হতো না।

কবিতা কি ছোটোবেলা থেকেই লিখতেন?
না , না , কবিতা লিখতে শুরু করেছি মূলত ২০১২ সাল থেকে। নাইন টেন থেকেই লেখার অভ্যাস কিছুটা ছিলো, কিন্তু তখনো জানতাম না, লিখতে পারি বা লিখবো এতো নিশ্চিতভাবে। এগুলো আরো অন্য সাক্ষাৎকারেও বলেছি সেসব কথায় আর না যাই, আপনি বলেন আমার কবিতার ক্ষেত্রে আপনার প্রধান অভিযোগ কী? সেটা জানলে আমি আপনাকে বলতে পারবো কীভাবে ম্যাথ আমাকে সাহায্য করেছে কবি হতে!

প্রধান অভিযোগ ঠিক না, প্রধান মন্তব্য হলো বেশ কঠিন সিনট্যাক্স, একটার পর একটা শব্দ বসিয়ে আপনি যেই একটা বাক্য তৈরি করেন, সমস্ত শব্দ চেনা তবুও বাক্যটা বোঝা গেলোনা পরিষ্কারভাবে। এটা কেনো?
আমার বইয়ে এসমস্ত প্রশ্নের সকল উত্তরই প্রায় আছে, আমার বইয়ে একটা লাইন আছে,
“ভাষা কেবল অর্থের দিকে যেতে চায়”, আরেকটা লাইন আছে,
“সমস্ত ভাষার মধ্যে কিলবিল করছে অর্থ”
আমি বোঝাতে চাইছি ভাষা কেবলই অহেতুক অর্থের দিকে যাচ্ছে। এটার তো দরকার নেই।

অহেতুক কেনো? আপনি কি চাচ্ছেন আমরা আপনার কবিতা পড়বো কিন্তু কিছুই ভাববো না?
ভাবনার ভাষাটা আসলে কী? আপনি ভাবার সময় কোন ভাষায় ভাবেন? কোন বিশেষ ভাষায় ভাবেন না কিন্তু। ভাবনার কিন্তু একটা আলাদা ভাষা আছে। সেটা কেবল আপনার কেননা আপনার যখন যেই ভাষায় ভাবতে ইচ্ছে করে আপনি সেভাবেই ভাবেন। সেটা না হিন্দি না বাংলা না আরবি! একটা ছোট বাচ্চাকে যখন ছবি আঁকতে দেন সে কিন্তু খুব উদ্ভট সব ছবিই আঁকবে এই ছবিটা ওর নিজের। ভাষাটা ওর নিজের। কিন্তু যখন ও সোসাইটির অংশ হয়ে ওঠে তখন ও ধীরে ধীরে সোসাইটির চাপিয়ে দেয়া ভাষা নিয়ে নেয়, ছবি নিয়ে নেয়। এসব কারণেই বড় হওয়ার পরই লোকে সামাজিক হয়ে ওঠে, শিশু সময়ে না। একই ভাবে আমরা যখন কবিতা লেখি বা পড়া শুরু করি তখন আমরা আমাদের পূর্ববর্তী সাহিত্যিকদের ভাষাকেই কবিতার ভাষা ভেবে নিচ্ছি। তাদের ভাষায়ই লেখা শুরু করি, আর পড়েছি বলে ওই ভাষার হিস্ট্রিটা আমাদের মধ্যে চলে আসে, তাই আমরা শুধু সেটাকেই বোঝা শুরু করি, কিন্তু নিজের ভেতর থেকে কিছু বেরিয়ে আসলে আমরা অবাক হই যে, এটা কী আসলে?! আমি আসলে ভাষার এই বিষয়গুলোকে চ্যালেঞ্জ করতে চাচ্ছি। আমি কী বলেছি, “কিলবিল করছে”। কিলবিল কিন্তু কোন পজেটিভ শব্দ না আসলে, এটা খুব বিরক্তকর! অস্বাভাবিকভাবে নড়াচড়ার মতো একটা বিষয়। আপনার এক্সপেরিয়েন্সকে কোন না কোনভাবে সেটা ডিস্টার্ব করছে।
অর্থকে আমি খুব ভালো চোখে দেখি না আসলে, কেনো দেখি না বলি, ব্যকরণের একটা নিজস্ব ভাষা আছে, ডাক্তারদের একটা নিজস্ব ভাষা আছে, প্রত্যেকটা ডিসিপ্লিন এবং প্রত্যেকটা বিনয়ের একটা করে আলাদা ভাষা আছে। আপনি খেয়াল করলেই দেখবেন আপনাকে ওই ভাষায় সে ভাবতে বাধ্য করছে। যেই ভাষাটা আসলে আপনার সেই ভাষাটা আপনি হারায়েই ফেলবেন। পাখিদের দেখবেন একেকটার ডাক একেকরকম। কিন্তু ওরা তো সব পাখিই ওদের একেকটার ডাক একেকরকম না হলেও তো হতো! কিন্তু আলাদা, ওরা যে যার যার মতো করে ডাকে। এজন্যই অর্থের ব্যপারটা আমার কাছে একেবারেই প্রাতিষ্ঠানিক লাগে। প্রতিষ্ঠান আপনাকে শিখিয়েছে, দ্যায়ার ইজ সামথিং লাইক মিনিং, তখন আপনি ভেবে নিয়েছেন হ্যা তাইলে মনে হয় অর্থ খুব দরকারি। সিমেন্টিক্স যে ব্যাপারটা ভাষাবিজ্ঞানে আছে, মানে অর্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে কঠিন বা মিস্ট্রিয়াস বিষয় আপনি খেয়াল করলেই দেখবেন সেটা কিন্তু “আর্থস্তর”। মানে একেকজনের কাছে একই বাক্য নানান ধরণের মিনিং তৈরি করে।  সঠিকভাবে অর্থের কোন ডেসটিনেশন থাকেনা মূলত। তো আমি যেটা চেয়েছিলাম সেটা হলো, আমি যেভাবেই ভাষাকে ব্যবহার করিনা কেনো পাঠক যেন এখান থেকে কোন লিনিয়ার মিনিং খুঁজে বের না করতে পারে। মানে সর্বসাকূল্যে এই কথার যা মানে সেরকম কোন কথা আমি বলতে চাইনি। এই নিয়মটা ভেঙ্গে যাক অর্থবোধক কিছু লেখার এটাই আমি চেয়েছি।

হাসান রোবায়েত

ইদানিং নিজেদের পোস্ট মর্ডান বলে থাকেন যারা এমন কবিদের লেখায় দেখা যায় পুরো কবিতার একটা নির্দিষ্ট ভাব আছে বা নেই, কিন্তু তার চেয়েও অভিনব ঘটনা হলো তাদের কবিতায় একটা লাইনের সাথে আরেকটা লাইনের কোনো মিল নেই। প্রথম লাইনের সাথে একেবারে শেষলাইনের কিছু মিল হয়তো থাকে কিন্তু পুরো কবিতাই মোটামুটি পরম্পরাহীন প্রতি লাইনে। এটা আপনার কবিতায়ও খেয়াল করেছি, এই সম্পর্কে আপনি কী বলেন?
হ্যা, এটা ঠিকই বোধয় বলেছেন, অনেকেই এই অভিযোগ করে আমার টেক্সট সম্পর্কে। তবে অন্যদেরটা সম্পর্কে তো কিছুই বলতে পারবো না, আমার এরকম লেখার কারণটাও অনেকটা সুচিন্তিত। এর আগেও হয়তো হয়েছে, কিন্তু সেগুলোতে আপনি হয়তো কোন না কোন মিল পাবেন। কিন্তু আমার কবিতায় তাও নেই। আমি মনে করি এটার দরকার নাই।

আপনার কি মনে হয়, আপনার মনে লেখার সময় মিল ছিলো, পাঠক মিল পাচ্ছে না। এরকম কী?
না, আমার সেরকমও মনে হয়না, অথবা আমার মস্তিষ্ক সেরকম্ভাবে ভাবেই না! আমি ইচ্ছা করেই মিল খুঁজি না।

কোন নির্দিষ্ট ভাবনা ছাড়া আপনি তাহলে কী নিয়ে কবিতা লেখেন?
হ্যা, এই যে ভালো কথা বলেছেন, আমি আসলে কিছু নিয়েই লেখি না। আমার লেখায় কোনো সাবজেক্ট নাই, সাবজেক্টকে আমি হিসেবে ফেলি না। আমাদের কবিদের এটা সীমাবদ্ধতা আমার মনে হয়! আপনি যখন আপনার ঘর সাজান আপনার ঘরে যেসব ফার্নিচার রাখেন একটার সঙ্গে কি আরেকটার কোনো মিল থাকে? থাকে না কিন্তু, কিন্তু আপনি সেটাকে ঘরই কিন্তু বলেন, আবার সাজানো গুছানো ঘরই কিন্তু বলেন। আপনার খাটের সঙ্গে আপনার ফ্রিজের কোন সম্পর্ক নেই, আপনার ফ্রিজের সঙ্গে আপনার টিপেরও কোন সম্পর্ক নেই, কিন্তু পুরোটা আপনার ঘর। সেটা যদি একটা ঘর হতে পারে তাহলে বিভিন্ন ভাবনার সমন্বয়ে কেনো আমার একটা কবিতা হতে পারবে না?

তাহলে আপনি একটা লাইনে একটা কবিতা লেখেন, সেটাও তো সম্ভব!
হুম, সম্ভব, আমার আছেও সেরকম কবিতা। আসলে এটা একটা প্রচণ্ড জটিল আলোচনা। আমি মূলত একটা মিউজিক লেখি।

গীত?
গীত অর্থে না এটা। একটা রিদম আছে এখানে, আমি একটা মিউজিককে লেখি। আপনি যখন ক্লাসিক মিউজিক যখন শুনবেন, ক্লাসিক মিউজিকের মিনিং কী? টেনটেনাটেনটেনা… বাজতে থাকে। এখন এই বাজে ওই বাজে! ধরেন, একটা ‘সরোদ’ বাজতেছে, সরোদের আগে পরে অনেক ধরণের সুর বাজতেছে। সবটা মিলে কিন্তু ওইখানে একটা মিউজিক্যাল পরিবেশ তৈরি হয়। নিজেকে যতোটুক বুঝি তাতে আমার মনে হয় আমি এই মিউজিকটাকেই লেখি ভাষার মাধ্যমে। আপনি নিজেও যখন পড়ে শেষ করবেন আপনি নিজেও অনুধাবন করবেন আপনি আসলে একটা মিউজিক থেকে বের হলেন।

হাসান রোবায়েত

তাহলে কি বলবো আপনার লেখার ভাব ভাবনা এবং স্টাইলটা স্বপ্নের মতো? স্বপ্নেও যেহেতু এরকমই হয়ে থাকে এলোপাতাড়ি ঘটনা ঘটে কিন্তু পুরোটা মিলে একটা স্বপ্ন…
মজার ব্যপারটা কিন্তু এটাই, হ্যা আমি স্বপ্ন দেখার মতোই লেখি, কারণ এগুলো কিন্তু আমাদের জিনের মধ্যেই আছে, এগুলো আমি বাইরে থেকে কিছু নিয়ে আসিনি। এমনও হওয়া অসম্ভব না যে স্বপ্নের ওই এক্সপেরিয়েন্সটাই আমার লেখার মধ্যে ফর্ম আকারে কবিতা আকারে চলে আসছে! আমার প্রশংসা হিসেবে যদি আমি বলি, আমার লেখা কিন্তু লোকে শিরোনাম ছাড়াও দেখলেই বুঝবে যে এটা হাসান রোবায়েতের লেখা! এই প্রশংসাটা আমিই কেবল করি না, বাংলাদেশ এবং কলকাতা দুই বাংলার মানুষই কিন্তু করে থাকে। এটা কিন্তু মিউজিক বলেন বা ল্যাংগুয়েজের ওই ধরনের আর্টিকুলেশন বলেন বা এর ক্রাফটের যে জায়গাগুলো আসলে সেজন্যই হয়তো হয়েছে! আমি আপনাকে একটা উদাহরণ দিচ্ছি, কোরআনের একটা সুরা, সেখানে কিন্তু একটা বিষয় নিয়ে লেখা হয় না। শুরু হচ্ছে কী দিয়ে শেষ হচ্ছে কী দিয়ে তার কোনো সামঞ্জস্য নেই। হয়তো দোজখের কথা বলছে, আবার দেখবেন একটা ঘটনা বলছে, আবার দেখবেন হয়ত বেহেশত বলছে, আবার কোথায়ও একটা চলে গেছে ইচ্ছে মতো। তাহলে পুরো টেক্সটে কিন্তু পরম্পরার যে ধারণা তা কিন্তু কোরআনেও নেই। এগুলোকে আজকে পোস্ট মর্ডান টেক্সট বলা হয়, কিন্তু হিউম্যান হিস্ট্রি ঘেটে দেখলেই বুঝবেন এই ধারা আগেও ছিলো।

লেখালেখি টিকে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভাষার কী অবদান?
টিকে থাকবে কি থাকবে না, এটা চিন্তা করে কিন্তু জেনুইন কবি সাহিত্যিক লেখেন না। কিন্তু এক্ষেত্রে একটা মতামত দেয়া যায় যে, আইডেন্টিটি ছাড়া কোনো সাহিত্যই কিন্তু টিকবে না! রবীন্দ্রনাথ, নজরুল বা শরৎচন্দ্র টাইপ লেখা হাজার লেখক লিখেও টিকে নেই কিন্তু, আমরা মনে রেখেছি রবি-শরৎকেই। আইডেন্টিক্যল হতে হয় সম্ভবত এই টেকাটেকির ব্যপারে। আমার ক্ষেত্র দিয়েই আমি বুঝতে পারি, যারতার লেখা কিন্তু আমি পড়ি না! আমার কাছে আইডেন্টিক্যল বা ইউনিক মনে হলেই আমি পড়ি, তাই মনে হয় সচেতন পাঠক হয়ত এটাই খুঁজবেন পাঠের ক্ষেত্রে।

পূর্বেকার কবিদের মধ্যে কাদের পড়েন?
শরৎ দিয়ে শুরু হয়েছিলো, কিন্তু এখন আর তাকে পড়ি না, হয়ত আর কখনোই পড়বো না। এখন মোটামুটি যা ভালো লাগে সবই পড়া হয়!

আপনি গদ্য লেখেন?
না, গদ্য লেখা হয় না! কবিতাই লেখি।

আপনি তো খুব অল্পদিন থেকেই কবিতা চর্চা শুরু করেছেন। কবে থেকে আপনার মনে হলো যে আপনার কবিতা হয়?
আসলে কী করলে কবিতা হয় সেটার তো কোনো মেজারমেন্টের মাত্রা নেই। আমি কখনো ভাবিইনি যে আমার কবিতা হচ্ছে কী হচ্ছে না। আপনি তো কাউকে বলতে পারবেন না যে তার কবিতা হচ্ছে না, আপনি আপনার পাঠ রুচি অনুযায়ী বড়জোর এটা বলতে পারেন যে, তার কবিতা ভালো লাগে না। হয়নি যদি বলেও থাকেন, সেটা আপনার কোরেস্পন্ডিং থেকে হয়নি, অন্য হাজার লোকের কাছে সেটা কবিতা হতেও পারে! এসব নিয়ে আমার কখনো চিন্তা আসেইনি।

হাসান রোবায়েত

প্রথম বইয়ের নাম “ঘুমন্ত মার্কারি ফুলে” সেটা কেমন নিলো পাঠক?
ভালোই মনে হয়। বাংলাদেশে চৈতন্য থেকে বেরিয়েছে ২০১৬তে। তারপর এই মেলায় কলকাতার একটা প্রকাশনী নিজ উদ্যোগে সেটা চেয়ে নিলো, এবং এবার তাদের মেলায় বের হলো। আমার কবিতা নিয়ে ওদের ভালো আগ্রহ দেখি কেনো জানি! এখানে যদি দশজনের আগ্রহ পাই, সেখানে হয়তো একশজনের পাই। এখন আর বাংলাদেশে সে বই পাওয়া যাচ্ছে না!

আপনার লেখা কি এরকমই থাকবে নাকি প্যাটার্ন চেঞ্জ হবে?
আসলে কবিতার ব্যাপার তো, এটা বলা যাচ্ছে না। ভাষার মাধ্যমে হয়তো, সেক্ষেত্রে ভাষা যেমন একইরকম চলতে থাকলে মরে যায়, আমার মনে হয় কবিতার ক্ষেত্রেও তাই ঘটে। তাই একেবারে একইরকম ঢং নিয়ে থাকার ইচ্ছা আমার নেই। প্রতিনিয়ত নতুন কিছুর মধ্য দিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা আছে এবং আমি খুব সচেতনভাবে এখনও কিন্তু সেটাই করে যাচ্ছি। আমার কাছে প্রায় পাঁচটা পাণ্ডুলিপি আছে, একটা বের হলো। এগুলোর প্রত্যেকটাই আলাদা আলাদা।

তারমানে কবিতার ক্ষেত্রে আপনার গবেষণাটা চলতেই থাকবে?
হ্যা, অবশ্যই। এটাই আমার একমাত্র আনন্দের কাজ। বাদবাকি কাজ প্রয়োজন।

আচ্ছা, আপনি আপনার একমাত্র কাজ নিয়েই বিভোর থাকুন, এই শুভকামনায় আজ শেষ করছি, ধন্যবাদ আপনাকে।
ধন্যবাদ আপনাকেও।

সৌজন্যে : এখন। ছবি : হাসান রোবায়েতের ফেসবুক পোস্ট (পাবলিক) থেকে।

You may also like

প্রকাশক : জিয়াউল হায়দার তুহিন

সম্পাদক : হামীম কেফায়েত

গ্রেটার ঢাকা পাবলিকেশন
নিউমার্কেট সিটি কমপ্লেক্স
৪৪/১, রহিম স্কয়ার, নিউমার্কেট, ঢাকা ১২০৫

যোগাযোগ : +8801712813999

ইমেইল : news@dhakabarta.net