মঙ্গলবার, জুন ২৫, ২০২৪

সেলেস্তির সঙ্গলাভের টোপে সাড়া দেন এমপি আনার

শাহীন নিজেও অ্যালকোহল ও নানা রকম মাদকে আসক্ত, পার্টিতে অংশগ্রহণ করলে সেলেস্তিও মাদক নিতেন।

by ঢাকাবার্তা
সেলেস্তি রহমান ও আনোয়ারুল আজিম আনার

বিশেষ প্রতিনিধি ।। 

ঝিনাইদহ-৪ আসনের এমপি আনোয়ারুল আজিম আনার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় চাঞ্চল্যকর নতুন নতুন তথ্য সামনে আসছে। আনারকে হত্যা করার জন্য আরও দুইবার চেষ্টা করা হয়েছিল। ব্যর্থ হয়ে তিনবারের চেষ্টায় মিশন সফল হয়। নানাভাবে পরিকল্পনা করে যখন মূলহোতা আকতারুজ্জামান শাহীন সফল হতে পারেননি তখন তার বান্ধবী সেলেস্তি রহমানের মাধ্যমে ফাঁদ পাতে। আনারকে ব্যবসায়িক আলোচনার পাশাপাশি সেলেস্তির সঙ্গলাভের টোপ দেন শাহীন। সেই টোপে সাড়া দেন আনার। সেলেস্তিকে বলা হয়েছিল বাংলাদেশ থেকে একজন ভিআইপি আসবেন তাকে সঙ্গ দিতে হবে। ঘটনার দিন সঞ্জীবায় লাল গাড়ি থেকে নেমে যাওয়ার সময় আনারের সঙ্গে যে তরুণীকে দেখা গেছে সেই তরুণীই সেলেস্তি। তার সঙ্গে আরও দুজন ব্যক্তি ছিলেন। ধারণা করা হচ্ছে তাদের একজন শিমূল ভূঁইয়া ওরফে আমানউল্লাহ সাইদ ও অন্যজন তানভির।

তার আগে হুন্ডি, স্বর্ণ ব্যবসার আলোচনার জন্য বন্ধু গোপাল বিশ্বাসের বাসা থেকে আনারকে ডেকে নেয় ঘাতকরা। বন্ধুর বাসা থেকে বের হওয়ার পর শিলাস্তি ও ওই দুজন আনারকে রিসিভ করে সঞ্জীবার একটি ফ্ল্যাটে নিয়ে আসেন। সেখানে আগে থেকে প্রস্তুত ছিল জিহাদ ও সিয়াম। পরিকল্পনা অনুযায়ী ক্লোরোফর্ম দিয়ে আনারকে অজ্ঞান করা হয়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল আনার চেতনা হারালে তার কিছু আপত্তিকর ছবি তুলে ব্ল্যাকমেইল করে টাকা আদায় করবেন। কিন্তু অতিরিক্ত চেতনানাশক প্রয়োগ করায় আনারের আর জ্ঞান ফিরেনি। এতে শিমুল, তানভির, জিয়াদ, সিয়ামসহ অন্যরা হতভম্ব হয়ে যায়। পরে তারা শাহীনের সঙ্গে যোগাযোগ করে। শাহীনের নির্দেশ মতোই আনারকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। পরে ট্রলিতে করে সেগুলো নিয়ে নিউটাউনের ভাঙড় এলাকার কয়েকটি জলাশয়ে ফেলে দেয়।
সেলেস্তি রহমান

সেলেস্তি রহমান

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পুরান ঢাকায় বেড়ে ওঠা বিবিএ দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সেলেস্তি রহমান শাহীনের দীর্ঘদিনের বান্ধবী। আমেরিকা প্রবাসী শাহীনের হাত ধরেই সেলেস্তি অন্ধকার জগতে পা রাখে। শাহীন দেশে এলেই তার সঙ্গে ক্লাবে, ফ্ল্যাটে রাত কাটাতেন। ঘুরে বেড়াতেন বিভিন্ন পার্টিতে। শাহীন নিজেও অ্যালকোহল ও নানা রকম মাদকে আসক্ত। ঠিক তেমনি পার্টিতে অংশগ্রহণ করলে সেলেস্তিও মাদক নিতেন। নেচে গেয়ে আনন্দ দিতেন শাহীনসহ অনেককে। অনেকটা বেপরোয়া জীবনযাপন করতেন সেলেস্তি। শুধু দেশে নয় শাহীনের সঙ্গে বিভিন্ন দেশেও যাতায়াত ছিল। বিশেষ করে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে হরহামেশাই শাহীন তাকে নিয়ে যেতো। কিন্তু সেলেস্তি শাহীনকে আমেরিকা প্রবাসী হিসাবেই জানতো। তার অন্ধকার জগতের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তেমন কিছুই জানতেন না। আনার হত্যার মিশন বাস্তবায়নের জন্য সেলেস্তিসহ অন্যদেরকে নিয়ে ৩০শে এপ্রিল ভারতে যায় শাহীন। সেলেস্তিকে বলা হয়েছিল বাংলাদেশ থেকে একজন ভিআইপি আসবে। তাকে সময় দেয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। এজন্য নিউমার্কেট থেকে থেকে অনেক কেনাকাটাও করে দেয়া হয়েছিল সেলেস্তিকে। তবে সেলেস্তি তদন্ত সংশ্লিষ্টদের জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের সময় সে সেখানে ছিল না। তিনি তখন অন্য একটি কক্ষে ছিলেন।

সেলেস্তি রহমান

সেলেস্তি রহমান

এদিকে, এমপি আনার হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য এখনও উদ্‌ঘাটন করতে পারেনি ডিবি। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কি কারণে এই হত্যাকাণ্ড সেটি এখনি বলা যাচ্ছে না। বেশকিছু ক্লু নিয়ে তদন্ত চলছে। গ্রেপ্তারকৃতদের রিমাণ্ডে এ নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তবে এরইমধ্যে ঝিনাইদহ এলাকায় রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার, চোরচালানের রুট পরিচালনা, স্বর্ণ ও হুন্ডি ব্যবসা নিয়ে দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব এমন বেশ কয়েকটি বিষয়কে সন্দেহ করে তদন্ত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন কর্মকর্তারা। সূত্রগুলো বলছে, পার্শ্ববর্তী দেশে স্বর্ণ চোরাচালানের রুট নিয়ন্ত্রণ করতেন আনার। তার মাধ্যমেই চোরচালানকারীরা বিদেশে স্বর্ণ পাচার করতেন। এরমধ্যে থেকেই বড় ধরনের কয়েকটি চালানের স্বর্ণ আনার আত্মসাৎ করেছেন। যার আনুমানিক মূল্য ২০০ কোটির মতো। এই স্বর্ণের মালিক আকতারুজ্জমান শাহীন। মূলত আত্মসাৎ করা এসব স্বর্ণ নিয়ে আনারের সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব। কিন্তু নানা কারণে শাহীন সেটি আনারকে বুঝতে দিতেন না। মনে মনে সেই ক্ষোভ পুষেছিলেন। সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন তাকে প্রতিশোধের। অনেকে ধারণা করছেন সেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশই এই হত্যাকাণ্ড। এ ছাড়া আনার টানা তিনবারের এমপি। দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা-বাণিজ্য, চোরাকারবার ও হুন্ডিতে আনার আধিপত্য বিস্তার করে আসছিলেন। তাই তাকে এই পথ থেকে না সরালে আর লম্বা সময় এখানে কেউ হাত দিতে পারবে না। এককভাবে আধিপত্য বিস্তার করাই তার জন্য কাল হয়েছে বলে মনে করছেন তদন্ত কর্মকর্তারা।

ওদিকে আনারের মরদেহ উদ্ধার নিয়ে এখন ধোঁয়াশা কাটছে না। বিভিন্ন আলামতের ভিত্তিতে ভারতীয় পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে তাকে হত্যা করা হয়েছে। আসামির জবানবন্দি মতে লাশ টুকরো টুকরো করা হয়েছে। কসাই জিহাদকে ভাড়া করে এনে আনারের মরদেহ টুকরো করিয়ে জলাশয়ে ফেলে লাশ গুম করা হয়েছে। আসামির দেয়া তথ্যমতে কলকাতার পুলিশ অনেক অভিযান পরিচালনা করেছে। কিন্তু লাশের কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। আদৌ পাওয়া যাবে কিনা সেটিও দেখার বিষয়।

You may also like

প্রকাশক : জিয়াউল হায়দার তুহিন

সম্পাদক : হামীম কেফায়েত

গ্রেটার ঢাকা পাবলিকেশন
নিউমার্কেট সিটি কমপ্লেক্স
৪৪/১, রহিম স্কয়ার, নিউমার্কেট, ঢাকা ১২০৫

যোগাযোগ : +8801712813999

ইমেইল : news@dhakabarta.net