শুক্রবার, ডিসেম্বর ১২, ২০২৫

ওভাল অফিসে আমন্ত্রণ পাওয়া মানেই সম্মান নয়

by ঢাকাবার্তা
ওভাল অফিসে ট্রাম্প ও রামাফোসা

ডেস্ক রিপোর্ট ।।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে তিন মাস পার হওয়ার পর এখন বিশ্বনেতাদের বুঝে যাওয়া উচিত, ওভাল অফিসে আমন্ত্রণ পাওয়া মানেই সম্মানজনক নয়—বরং সেই আমন্ত্রণের সঙ্গে থাকে প্রকাশ্যে অপমানিত হওয়ার ঝুঁকি। হোয়াইট হাউজের সাম্প্রতিক বৈঠকগুলোর ধারা যেন একেকটি সুপরিকল্পিত উসকানি ও বিব্রতকর পরিস্থিতির উদাহরণ। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসার সঙ্গে গতকাল বুধবারের বৈঠক ছিল এ চিত্রের চূড়ান্ত রূপ। খবর বিবিসি বাংলার।

বৈঠকটি যেন রামাফোসাকে হেনস্তা করার জন্য আগেভাগেই সাজানো মঞ্চ। আলো নিভিয়ে বড় স্ক্রিনে ভিডিও চালানো, পুরনো খবরের কাটিং সামনে এনে প্রশ্ন ছুড়ে দেওয়া—সব মিলিয়ে পুরো দৃশ্যপট ছিল পরিকল্পিত ও উদ্দেশ্যপ্রসূত।

টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে দুই দেশের প্রেসিডেন্টের স্বাভাবিক আলাপচারিতার মধ্যে হঠাৎ এক সাংবাদিক প্রশ্ন তোলেন: “ট্রাম্পকে কীভাবে বোঝানো যাবে যে দক্ষিণ আফ্রিকায় ‘হোয়াইট জেনোসাইড’ ভিত্তিহীন?” উত্তরে রামাফোসা বলেন, বিষয়টি বোঝার জন্য ট্রাম্পকে দক্ষিণ আফ্রিকার মানুষের কথা শুনতে হবে। ঠিক তখনই ট্রাম্প সহকারীদের নির্দেশ দেন—আলো নিভাও, টিভি চালাও। শুরু হয় ভিডিও প্রজেকশন।

পেছনের সোফায় নীরব দর্শকের মতো বসে ছিলেন ট্রাম্পের উপদেষ্টা ইলন মাস্ক—দক্ষিণ আফ্রিকায় জন্ম নেওয়া ধনকুবের। এরপর হোয়াইট হাউজ থেকে দক্ষিণ আফ্রিকায় শ্বেতাঙ্গদের কথিত নিপীড়ন নিয়ে একটি পরিকল্পিত অভিযোগ উপস্থাপন করা হয়।

এর আগে গত ফেব্রুয়ারিতেও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে এভাবে হোয়াইট হাউজে ডেকে অপমানজনক আচরণ করেছিলেন ট্রাম্প।

এই পর্বে এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে ট্রাম্প দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গ কৃষকদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগে একের পর এক ভিডিও ও ছবি দেখাতে থাকেন। ভিডিওতে ‘শুট দ্য বুর’ গান গাইতে দেখা যায় কিছু নেতাকে। এই গানটি যদিও বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের প্রতীক, ট্রাম্প এটিকে তুলে ধরেন শ্বেতাঙ্গবিদ্বেষের উদাহরণ হিসেবে।

অবিশ্বাসী হলেও, ট্রাম্প এবার গণমাধ্যমেই প্রচারিত এসব প্রতিবেদনকে খুশিমনে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করেন। প্রশ্ন উঠলে, গণকবরগুলো কোথায়? তিনি শুধু বলেন, “সাউথ আফ্রিকা।” ভিডিওতে দেখা ব্যক্তিদের সবাইকেই তিনি শাসক গোষ্ঠীর সদস্য ধরে নিয়ে বলেন, তারা জমি কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা রাখেন—যা আসলে সত্য নয়।

রামাফোসা চলতি বছরে একটি বিতর্কিত আইন অনুমোদন করেছেন, যা ক্ষতিপূরণ ছাড়াই জমি অধিগ্রহণের সুযোগ দেয়। তবে আইনটি এখনো বাস্তবায়ন হয়নি।

ভিডিওতে প্রদর্শিত রাজনৈতিক বক্তব্য থেকে রামাফোসা নিজেকে আলাদা করেছেন। তবে তিনি বৈঠকে ছিলেন পুরোপুরি প্রস্তুত। তিনি শুধু একজন প্রেসিডেন্ট নন—নেলসন ম্যান্ডেলার ঘনিষ্ঠ সহযোগী, বর্ণ বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা।

ট্রাম্প প্রায়ই অন্যদেশের নেতাদের কৌশলগত প্রশংসা বুঝতে পারেন না। রামাফোসা সেটিই কাজে লাগান। আলোচনার টেবিলে দক্ষিণ আফ্রিকার দুই শীর্ষ গলফার—এর্নি এলস ও রেটিফ গুসেনকে নিয়ে আসেন তিনি, যাদের ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ করেন। ফলে আক্রমণাত্মক পরিবেশ কিছুটা নমনীয় হয়।

পুরনো খবর টেনে রামাফোসার ওপর চাপ তৈরির চেষ্টার মধ্যেও এই গলফারদের উপস্থিতি ট্রাম্পকে আনন্দিত করে। বৈঠকে শ্বেতাঙ্গ কৃষকদের ভবিষ্যৎ নিয়ে গলফার ও কৃষিমন্ত্রী যতটুকু বলেছিলেন, রামাফোসা তার চেয়েও সংযত ও চিন্তাভাবনা করে বক্তব্য দেন। এটি ছিল তার কৌশল।

গলফার ও কৃষিমন্ত্রী—দুজনেই শ্বেতাঙ্গ, এবং কৃষিমন্ত্রী নিজে একজন বিরোধী দলের সদস্য, বর্তমানে জাতীয় ঐক্য সরকারের অংশ। এই তিনজনের উপস্থিতিতে রামাফোসার চারপাশে যেন তৈরি হয় এক ধরনের কূটনৈতিক ‘গোল্ডেন ডোম’, যা তার পক্ষেই কাজ করে।

তবুও ট্রাম্প বারবার শ্বেতাঙ্গ কৃষকদের প্রসঙ্গ টানেন। বলেন, অনেক কৃষককে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে শরণার্থী হিসেবে জায়গা দিয়েছেন। কিন্তু রামাফোসা কোনো উসকানিতেই সাড়া দেননি।

এক পর্যায়ে তিনি ট্রাম্পকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “আফ্রিকায় যদি সত্যিই শ্বেতাঙ্গ কৃষকদের গণহত্যা চলত, তাহলে তারা আজ এখানে থাকতেন না। আমি আপনাকে হলফ করে বলছি।”

ডোনাল্ড ট্রাম্প এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চাপ তৈরি করলেও প্রত্যাশিত প্রতিক্রিয়া মেলেনি। তবে তার প্রচেষ্টা পুরোপুরি ব্যর্থও বলা যাবে না।

এই অভিনয়ধর্মী কূটনীতি যতটা না রামাফোসার উদ্দেশ্যে, তার চেয়ে বেশি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ দর্শকদের জন্য। ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ মিশনের অন্যতম কৌশল হলো জনগণের ক্ষোভকে জিইয়ে রাখা। ট্রাম্প জানেন, তার সমর্থকরা কী দেখতে চায়।

তবে এখন, যখন কিছু বিদেশি নেতা তার এই কৌশল সামলাতে শিখে ফেলেছেন, ট্রাম্পকেও হয়তো তার পরিকল্পনায় কিছুটা বদল আনতে হবে।

You may also like

প্রকাশক : মানজুর এলাহী

সম্পাদক : হামীম কেফায়েত

ব‌ইচিত্র পাবলিশার্স
প্যারিদাস রোড, বাংলাবাজার, ঢাকা ১১০০
যোগাযোগ : +8801712813999
ইমেইল : news@dhakabarta.net