প্রোফাইল ডেস্ক ।।
লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মীর শওকত আলী বাংলাদেশের ইতিহাসের এক বহুমাত্রিক ও দৃঢ়চেতা ব্যক্তিত্ব। তিনি একাধারে একজন পেশাদার সামরিক কর্মকর্তা, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সেক্টর কমান্ডার, রাষ্ট্রদূত এবং পরবর্তী সময়ে রাজনীতিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য বীরত্বের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বীরত্বসূচক খেতাব ‘বীর উত্তম’ প্রদান করে।
মীর শওকত আলীর জন্মস্থান ও জন্মতারিখ বিষয়ে বিভিন্ন সূত্রে কিছু পার্থক্য দেখা যায়। অধিকাংশ নির্ভরযোগ্য জীবনী ও সরকারি তথ্যানুযায়ী তাঁর জন্ম ১৯৩৮ সালের ১১ জানুয়ারি, ঢাকার পুরনো শহরের নাজিরা বাজারের আগাসাদেক রোডে। তবে একটি সংবাদসূত্রে তাঁর জন্ম ৯ ডিসেম্বর ১৯৩৬ বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। শৈশব ও কৈশোর কেটেছে পুরনো ঢাকার পরিবেশে, যা তাঁর ব্যক্তিত্ব গঠনে গভীর প্রভাব ফেলে।
তিনি ঢাকার মাহুতটুলি ফ্রি প্রাইমারি স্কুল (কিছু সূত্রে মাহুতটুলি প্রি-প্রাইমারি) থেকে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। ১৯৫৩ সালে আরমানিটোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন; কিছু বর্ণনায় চার বিষয়ে লেটার মার্কসের কথাও উল্লেখ আছে। এরপর ১৯৫৫ সালে ঢাকা কলেজ থেকে আইএসসি (এইচএসসি) পাস করেন।
পরবর্তীতে তিনি পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে ক্যাডেট হিসেবে যোগ দেন এবং ১৯৫৮ সালে বিএসসি ডিগ্রি অর্জন ও পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কমিশন লাভ করেন।
১৯৫৫ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত তিনি বিভিন্ন রেজিমেন্টে অ্যাডজুট্যান্ট, কোয়ার্টার মাস্টার, কোম্পানি কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং সামরিক গোয়েন্দা বিভাগেও কাজ করেন। ১৯৬৫ সালের পাক–ভারত যুদ্ধে তিনি রংপুর সীমান্তে অংশগ্রহণ করেন।
১৯৭১ সালে তিনি পাকিস্তানের কোয়েটা কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজ থেকে পিএসসি ডিগ্রি লাভ করে চট্টগ্রামের ষোলোশহরে ৮ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগ দেন। তখন তাঁর পদ ছিল মেজর।
২৫ মার্চ ১৯৭১ রাতে ঢাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার সংবাদ পাওয়ার পর তিনি ৮ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সঙ্গে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন এবং রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। ৩০ মার্চের পর পুরো রেজিমেন্টের দায়িত্ব তাঁর ওপর ন্যস্ত হয়।
তিনি কালুরঘাট যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন এবং এপ্রিলের শুরু থেকে ২ মে ১৯৭১ পর্যন্ত সেনাবাহিনী, বিডিআর, ছাত্র-জনতা ও আওয়ামী লীগের স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে গঠিত বাহিনী পরিচালনা করেন। কালুরঘাট প্রতিরক্ষা অবস্থান পতনের পর তিনি বান্দরবন হয়ে মহালছড়িতে সদর দপ্তর স্থাপন করেন। প্রবল আক্রমণের মুখে তিনি রামগড় দিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতের ভেতরে যান। পরবর্তীতে ছাতক ও সুনামগঞ্জ এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করে যুদ্ধ পরিচালনা করেন।
মুজিবনগর সরকার গঠনের পর তাঁকে ৫ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক নিযুক্ত করা হয়। এই সেক্টরের বিস্তৃতি ছিল সিলেটের ডাউকি (তামাবিল) থেকে ময়মনসিংহ সীমান্ত পর্যন্ত। মাত্র ৪০০ মুক্তিযোদ্ধা দিয়ে যুদ্ধ শুরু করে তিনি একসময় ১২ হাজার মুক্তিযোদ্ধার বিশাল বাহিনী গড়ে তোলেন।
৫ নম্বর সেক্টরে তাঁর নেতৃত্বে সংঘটিত উল্লেখযোগ্য অভিযানগুলোর মধ্যে রয়েছে: জৈন্তাপুর (২৮ সেপ্টেম্বর), ছাতক (১৩ অক্টোবর), গোয়াইনঘাট (২৩ অক্টোবর), তাহেরপুর (৩ নভেম্বর), রাজাপুর (২৩ নভেম্বর), বর্নী (২৫ নভেম্বর), রাজানগর (২৬ নভেম্বর), বনগাঁও (২৭ নভেম্বর), টেংরাটিলা (৩০ নভেম্বর), সালুটিকা (৬ ডিসেম্বর), লামাকাজি (১৫ ডিসেম্বর) ও খাদিমনগর আক্রমণ (১৫ ডিসেম্বর)। ১৯৭১ সালের আগস্টের শেষ সপ্তাহে তিনি লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে উন্নীত হন।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পুনর্গঠনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭২–৭৪ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে একটি ইনফ্যান্ট্রি ব্রিগেড গঠন ও ব্রিগেড কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন ব্রিগেডের কমান্ডার, ১৯৭৫ সালে চিফ অব জেনারেল স্টাফ, এবং ১৯৮০–৮১ সালে প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
একই সময়ে তিনি পুরনো ঢাকা উন্নয়ন কমিটির চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি, এবং ঢাকা অঞ্চলের সামরিক প্রশাসক হিসেবেও কাজ করেন।
তিনি ৯ জুন ১৯৮১ তারিখে লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
অবসর গ্রহণের পরপরই তিনি রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ পান। তিনি মিসর, সুদান, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও পর্তুগালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত/হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৮ সালে সামরিক স্বৈরশাসনের প্রতিবাদে তিনি রাষ্ট্রদূতের পদ থেকে পদত্যাগ করেন।
এরপর তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠিত বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৮৮ সালে তিনি ঢাকা মহানগর বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালে ঢাকার লালবাগ (ঢাকা-৮) আসন থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
১৯৯১–১৯৯৬ মেয়াদে তিনি প্রথমে খাদ্যমন্ত্রী, পরে শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি ছিলেন।
পরবর্তীকালে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে বিএনপির রাজনৈতিক জোট নিয়ে তাঁর সঙ্গে দলের দূরত্ব সৃষ্টি হয়। তিনি সহসভাপতির পদ থেকে পদত্যাগপত্র দিলেও দল তা গ্রহণ করেননি। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে তিনি ধানমন্ডি আসন থেকে পরাজিত হন।
২০০৭ সালের পর থেকে তিনি সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। তিনি ছিলেন এই আন্দোলনের অন্যতম অগ্রপথিক। ২০০৯ সালে তিনি সক্রিয় রাজনীতি থেকে স্বেচ্ছা অবসর নেন।
মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বের জন্য তিনি ‘বীর উত্তম’ খেতাব লাভ করেন। ক্রীড়া ও কৃষি খাতে অবদানের জন্য দু’বার রাষ্ট্রপতি পদক পান।
তিনি তাঁর আত্মজীবনী The Evidence নামে তিন খণ্ডে প্রকাশ করেন, যা ২০০৮ সালে প্রকাশিত হয়।
২০ নভেম্বর ২০১০, শনিবার সন্ধ্যায় ঢাকার গুলশানের মার্শাল হাউজে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুকালে বয়স বিভিন্ন সূত্রে ৭২ থেকে ৭৪ বছর উল্লেখ করা হয়েছে। পরদিন ২১ নভেম্বর ২০১০ তাকে বনানী সামরিক কবরস্থানে রাষ্ট্রীয় ও সামরিক মর্যাদায় সমাহিত করা হয়।
