ঢাবি প্রতিনিধি ।।
বিশিষ্ট ভাস্কর ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সাবেক অধ্যাপক হামিদুজ্জামান খান আর নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। রোববার (২০ জুলাই) সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৭ বছর।
ভাস্কর হামিদুজ্জামান খান ছিলেন বাংলাদেশের আধুনিক ভাস্কর্য আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃত। ১৯৪৬ সালে ময়মনসিংহে জন্ম নেওয়া এই শিল্পী দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে শিল্পচর্চার মাধ্যমে দেশের শিল্পভুবনে রেখেছেন গৌরবোজ্জ্বল অবদান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ভাস্কর্য বিভাগ গঠনে তিনি ছিলেন অগ্রণী ভূমিকার অধিকারী। শিক্ষক হিসেবেও তাঁর অবদান অনন্য। তাঁর হাতে গড়া অনেক শিক্ষার্থী আজ দেশে-বিদেশে স্বনামধন্য শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

নিজের এক প্রদর্শনীতে তৎকালীন জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক–ই–ইলাহী চৌধুরীর সঙ্গে কথোপথনরত। সঙ্গে স্ত্রী ভাস্কর আইভি জামান
শিল্পজগতে হামিদুজ্জামানের যাত্রা শুরু হয় ষাটের দশকে। তিনি ভাস্কর্য, চিত্রকলা এবং স্থাপত্যশৈলীর এক সম্মিলিত ধারায় কাজ করে গড়ে তুলেছিলেন একটি স্বতন্ত্র শিল্পভাষা। তাঁর কাজের মূল উপজীব্য ছিল ইতিহাস, স্বাধীনতা সংগ্রাম, মানুষের আত্মত্যাগ এবং সামাজিক রূপান্তরের দলিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি নিয়ে তৈরি তাঁর একাধিক ভাস্কর্য জাতীয়ভাবে প্রশংসিত ও স্বীকৃত। তিনি জাতীয় স্মৃতিসৌধ নির্মাণ কার্যক্রমেও সহযোগিতা করেছিলেন, যা তাঁর রাষ্ট্রীয় মনন ও দায়িত্ববোধেরই প্রতিফলন।
হামিদুজ্জামান খান ছিলেন একজন নান্দনিক চিন্তক। ধাতু, পাথর ও কাঠের মতো কঠিন উপাদান দিয়ে তিনি মানুষের অনুভব ও ইতিহাসকে ফুটিয়ে তুলেছেন অপূর্ব দক্ষতায়। তাঁর শিল্পকর্মে আধুনিকতা ও দেশীয় সংস্কৃতির সমন্বয় চোখে পড়ে। পশ্চিমা বিমূর্ত শিল্পরীতিকে তিনি নিজের মতো করে আত্মস্থ করে তা বাঙালি চেতনার আলোয় রূপ দিয়েছিলেন নতুন এক ধারায়। বাংলাদেশের শিল্পচর্চাকে তিনি আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরেছেন বহুবার; অংশ নিয়েছেন দেশ-বিদেশের বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রদর্শনীতে।
তাঁর কর্মজীবনের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি একাধিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো একুশে পদক, যা তিনি পেয়েছিলেন দেশের ভাস্কর্য শিল্পে অনন্য অবদানের জন্য।

সামিট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজিজ খানকে নিজের শিল্পকর্ম সম্পর্কে ব্রিফ করছেন হামিদুজ্জামান খান।
শিল্পচর্চার পাশাপাশি তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী ও নিঃসঙ্গ সাধক, যিনি নিজের প্রচার না করে কাজকে গুরুত্ব দিতেন। বাংলাদেশের নাগরিক শিল্পচর্চায় তাঁর যে মৌলিক অবদান, তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিল্পীদের পথ দেখাবে দীর্ঘকাল।
ভাস্কর হামিদুজ্জামানের মৃত্যুতে দেশের শিল্পাঙ্গনে এক অপূরণীয় শূন্যতা তৈরি হলো। রাষ্ট্র, বিশ্ববিদ্যালয়, সংস্কৃতি অঙ্গন এবং তাঁর অসংখ্য গুণমুগ্ধ ছাত্র ও অনুরাগী গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
এক নজরে হামিদুজ্জামান খান
- জন্ম: ১৯৪৬, ময়মনসিংহ
- পেশা: ভাস্কর, চিত্রশিল্পী ও অধ্যাপক
- কর্মস্থল: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ
- গুরুত্বপূর্ণ কাজ: বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য, জাতীয় স্মৃতিসৌধে অংশগ্রহণ
- পুরস্কার: একুশে পদকসহ একাধিক জাতীয় সম্মাননা
- মৃত্যু: ২০ জুলাই ২০২৫, ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে
প্রয়াত এই গুণী শিল্পীর প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধা।