শুক্রবার, ডিসেম্বর ১২, ২০২৫

দ্রুজ সম্প্রদায়: মধ্যপ্রাচ্যের এক রহস্যময় ধর্মীয় গোষ্ঠী

দ্রুজ সম্প্রদায় মধ্যপ্রাচ্যের একটি স্বতন্ত্র ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সম্প্রদায়, যারা প্রধানত লেবানন, সিরিয়া, ইসরায়েল এবং জর্ডানে বাস করে। সাম্প্রতিক সময়ে সিরিয়ায় ইসরায়েলি হামলার প্রেক্ষিতে এই সম্প্রদায় বাংলাদেশে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। এই প্রতিবেদনটি দ্রুজ সম্প্রদায়ের উৎপত্তি, ধর্মীয় বিশ্বাস, ঐতিহাসিক পটভূমি এবং সিরিয়া ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক সংঘাতে তাদের ভূমিকা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রদান করবে।

by ঢাকাবার্তা
দ্রুজ সম্প্রদায়ের একজন সদস্য

ঢাকাডক্স ।। 

দ্রুজ ধর্মের সূচনা হয় ১১শ শতাব্দীতে মিশরের ফাতিমীয় খিলাফতের সময়। এটি ইসমাইলি শিয়া ইসলামের একটি শাখা থেকে উদ্ভূত হয়, যদিও এখন এটি একটি স্বাধীন ধর্ম হিসেবে বিবেচিত। ফাতিমীয় খলিফা আল-হাকিম বি-আমর আল্লাহ (৯৯৬-১০২১ খ্রিস্টাব্দ) এর শাসনামলে হামজা ইবন আলী ইবন আহমদ আল-জুজানি নামক একজন ধর্মীয় নেতা এই আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পরিচিত। তবে, সম্প্রদায়ের নামটি এসেছে মুহাম্মদ বিন ইসমাইল নাশতাকিন আদ-দারাজি নামক একজন প্রচারকের নাম থেকে, যিনি হামজার প্রাক্তন শিষ্য ছিলেন এবং পরে তাঁর সাথে মতবিরোধে জড়িয়ে পড়েন। আদ-দারাজি নিজেকে “ধর্মের তরবারি” হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন, যা হামজা প্রত্যাখ্যান করেন। ফলে, দ্রুজরা আদ-দারাজিকে কাফের (হেরেটিক) হিসেবে বিবেচনা করে, কিন্তু তার নামের সাথে সম্প্রদায়ের নাম যুক্ত হয়ে যায়।

একটি দ্রুজ পরিবার ইসরায়েল থেকে সিরিয়ায় ফিরছে।

একটি দ্রুজ পরিবার ইসরায়েল থেকে সিরিয়ায় ফিরছে।

আল-হাকিমের রহস্যজনক নিখোঁজ হওয়ার পর (১০২১ খ্রিস্টাব্দ) এবং তার উত্তরসূরি আল-জাহিরের শাসনামলে দ্রুজ সম্প্রদায় মিশরে নিপীড়নের শিকার হয়। এর ফলে তারা সিরিয়া ও লেবাননের পাহাড়ি অঞ্চলে চলে যায়, যেখানে তারা তাদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয় বজায় রাখে।

ধর্মীয় বিশ্বাস ও বৈশিষ্ট্য

দ্রুজ ধর্ম একটি একেশ্বরবাদী ধর্ম, যা ইসমাইলি শিয়া ইসলাম, খ্রিস্টধর্ম, গ্রিক দর্শন, গুপ্তবাদ, হিন্দুধর্ম এবং বৌদ্ধধর্মের বিভিন্ন উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত। তাদের বিশ্বাসের কিছু মূল বৈশিষ্ট্য হলো:

  • পুনর্জন্ম: দ্রুজরা বিশ্বাস করে যে মৃত্যুর পর আত্মা তাৎক্ষণিকভাবে আরেকটি দ্রুজ শিশুর দেহে পুনর্জন্ম লাভ করে। এই বিশ্বাস তাদের শোক প্রকাশের ধরণকে প্রভাবিত করে।
  • গোপনীয়তা: তাদের ধর্মীয় শিক্ষা অত্যন্ত গোপনীয়। শুধুমাত্র “উক্কাল” নামক নির্বাচিত ধর্মীয় নেতারাই পূর্ণ ধর্মীয় শিক্ষার অংশীদার হতে পারেন। সাধারণ দ্রুজ (জুহ্হাল) এই শিক্ষার পূর্ণ বিবরণ জানেন না। তাদের পবিত্র গ্রন্থ “কিতাব আল-হিকমা” শুধুমাত্র উক্কালদের জন্য উন্মুক্ত।
  • ধর্মান্তর ও বিয়ে: দ্রুজ ধর্মে বাইরের কাউকে ধর্মান্তরিত করা বা সম্প্রদায়ের বাইরে বিয়ে করা নিষিদ্ধ। এটি তাদের সম্প্রদায়ের বিশুদ্ধতা ও স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখে।
  • নৈতিকতা ও জীবনধারা: দ্রুজরা সত্য কথা বলা, দানশীলতা এবং আত্ম-নিয়ন্ত্রণের উপর জোর দেয়। তারা শান্তিপ্রিয় এবং সম্প্রদায়ের প্রতি আনুগত্যের জন্য পরিচিত।

দ্রুজ সম্প্রদায়ের ভৌগোলিক উপস্থিতি

বিশ্বব্যাপী দ্রুজ জনসংখ্যা প্রায় ১০ লাখ থেকে ১২ লাখ, অনেকে মনে করেন তার চেয়ে বেশি। তাদের প্রধান বসবাসের অঞ্চলগুলো হলো:

  • সিরিয়া: প্রায় ৭০০,০০০ দ্রুজ সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের সুয়াইদা প্রদেশে এবং জাবাল আল-দ্রুজ (দ্রুজদের পাহাড়) এলাকায় বাস করে। তারা দেশের জনসংখ্যার প্রায় ৩%।
  • লেবানন: প্রায় ২৫০,০০০ দ্রুজ লেবাননের শুফ ও আলেয় পর্বত অঞ্চলে বাস করে, যা দেশের জনসংখ্যার ৫.৫%।
  • ইসরায়েল: প্রায় ১৫০,০০০ দ্রুজ ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলের গালিল ও মাউন্ট কারমেল এবং ইসরায়েল-অধিকৃত গোলান মালভূমিতে বাস করে। তারা দেশের জনসংখ্যার ১.৬%।
  • জর্ডান ও প্রবাসী: জর্ডানে প্রায় ২০,০০০ দ্রুজ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপে ছোট প্রবাসী সম্প্রদায় রয়েছে।

ঐতিহাসিক পটভূমি

দ্রুজ সম্প্রদায় ঐতিহাসিকভাবে বিভিন্ন শাসক ও ধর্মীয় গোষ্ঠীর নিপীড়নের শিকার হয়েছে। মুসলিম শাসনামলে তাদের প্রায়ই হেরেটিক হিসেবে বিবেচনা করা হতো, এবং তাদের ধর্মীয় স্থান ধ্বংস ও জোরপূর্বক ধর্মান্তরের ঘটনা ঘটেছে। ১৯শ শতাব্দীতে অটোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে দ্রুজরা বিদ্রোহ করেছিল, যার ফলে তাদের উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয়।

লেবাননে এক ঈদে দ্রুজ নারীরা

লেবাননে এক ঈদে দ্রুজ নারীরা

লেবাননে দ্রুজরা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ছিল, বিশেষ করে কামাল জুমব্লাত এবং তার পুত্র ওয়ালিদ জুমব্লাতের নেতৃত্বে প্রোগ্রেসিভ সোশালিস্ট পার্টির মাধ্যমে। সিরিয়ায় তারা ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইসরায়েলে, দ্রুজরা ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠনের সময় থেকে রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করে এবং ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীতে (আইডিএফ) যোগদান করে। তবে, গোলান মালভূমির দ্রুজরা নিজেদের সিরিয়ান হিসেবে পরিচয় দেয় এবং ইসরায়েলি নাগরিকত্ব গ্রহণ করতে অস্বীকার করে।

সিরিয়া ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক সংঘাতে দ্রুজ সম্প্রদায়

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বাশার আল-আসাদের পতনের পর সিরিয়ার নতুন সরকারের নেতা আহমেদ আল-শারা (পূর্বে হায়াত তাহরির আল-শামের নেতা) ক্ষমতায় আসেন। এই পরিবর্তনের পর সুয়াইদা প্রদেশে দ্রুজ মিলিশিয়া এবং সুন্নি বেদুইন গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়, যা ২০২৫ সালের জুলাইয়ে তীব্রতর হয়। এই সংঘর্ষে অন্তত ৩৫০ জন নিহত হয়, যার মধ্যে বেসামরিক নাগরিক ও যোদ্ধারা রয়েছে।

ইসরায়েল এই সংঘর্ষে হস্তক্ষেপ করে, দাবি করে যে তারা সিরিয়ার দ্রুজ সম্প্রদায়কে রক্ষা করছে। ১৫ ও ১৬ জুলাই, ২০২৫-এ ইসরায়েলি বিমান হামলায় সিরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সামরিক স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু করা হয়। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, এই হামলার উদ্দেশ্য ছিল দ্রুজদের উপর হামলা রোধ করা এবং সিরিয়ার সামরিক বাহিনীকে দক্ষিণ সিরিয়ায় মোতায়েন থেকে বিরত রাখা। তবে, সিরিয়ার সরকার এবং কিছু দ্রুজ নেতা, যেমন লেবাননের ওয়ালিদ জুমব্লাত, ইসরায়েলের এই হস্তক্ষেপকে সাম্প্রদায়িক বিভেদ সৃষ্টির প্রচেষ্টা হিসেবে অভিযুক্ত করেছেন।

ফুটবল হাতে এক দ্রুজ নারী

গোলান মালভূমিতে ফুটবল হাতে এক দ্রুজ নারী

গোলান মালভূমির দ্রুজরা এই সংঘর্ষের সময় তাদের সিরিয়ান আত্মীয়দের সমর্থনে সীমান্ত অতিক্রম করে। ইসরায়েলি দ্রুজরাও সীমান্তে সমবেত হয়ে প্রতিবাদ করে এবং তাদের ধর্মীয় নেতা শেখ মুয়াফাক তারিফ ইসরায়েল সরকারের কাছে সিরিয়ার দ্রুজদের রক্ষার জন্য হস্তক্ষেপের আহ্বান জানান। এই ঘটনা ইসরায়েল ও সিরিয়ার দ্রুজ সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐতিহাসিক ও পারিবারিক বন্ধনের প্রতিফলন ঘটায়।

বাংলাদেশে আলোচনার প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশে দ্রুজ সম্প্রদায়ের নাম অপরিচিত হলেও, সিরিয়ায় ইসরায়েলি হামলার প্রেক্ষিতে সামাজিক মাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে এই সম্প্রদায় নিয়ে কৌতূহল বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, বিশেষ করে ইসরায়েল-সিরিয়া উত্তেজনা, বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতি সংহতি এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার বিষয়ে আলোচনাকে উস্কে দিয়েছে। দ্রুজদের গোপনীয় ধর্মীয় বিশ্বাস এবং তাদের সংঘবদ্ধ সম্প্রদায়ের প্রকৃতি বাংলাদেশের মানুষের কাছে কৌতূহলের বিষয় হয়ে উঠেছে।

উপসংহার

দ্রুজ সম্প্রদায় মধ্যপ্রাচ্যের একটি অনন্য ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী, যারা তাদের গোপনীয় বিশ্বাস, পুনর্জন্মে আস্থা এবং সম্প্রদায়ের প্রতি আনুগত্যের জন্য পরিচিত। সিরিয়ার সাম্প্রতিক সংঘাতে তাদের ভূমিকা এবং ইসরায়েলের হস্তক্ষেপ তাদেরকে আন্তর্জাতিক মনোযোগের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। বাংলাদেশে এই সম্প্রদায় সম্পর্কে ক্রমবর্ধমান আগ্রহ মধ্যপ্রাচ্যের জটিল রাজনৈতিক ও ধর্মীয় গতিশীলতা বোঝার একটি সুযোগ প্রদান করে। তাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানা আমাদেরকে আঞ্চলিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের চ্যালেঞ্জগুলো বুঝতে সাহায্য করবে।

You may also like

প্রকাশক : মানজুর এলাহী

সম্পাদক : হামীম কেফায়েত

ব‌ইচিত্র পাবলিশার্স
প্যারিদাস রোড, বাংলাবাজার, ঢাকা ১১০০
যোগাযোগ : +8801712813999
ইমেইল : news@dhakabarta.net