স্টাফ রিপোর্টার ।।
পবিত্র ঈদুল আজহা আসন্ন। কোরবানির পশুর হাট জমে উঠছে সারা দেশে। গত বছরের তুলনায় এবার পশুর জোগান বেশি থাকলেও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং বাজারের চাহিদার কারণে দাম কিছুটা বাড়তে পারে বলে মনে করছেন খামারি, ব্যাপারী ও সংশ্লিষ্টরা। গত বছর (২০২৪) এবং তার আগের বছরের (২০২৩) দামের সঙ্গে তুলনা করে এবারের সম্ভাব্য দরদাম নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে।
এবারের (২০২৫) সম্ভাব্য দরদাম
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এবার কোরবানির জন্য প্রস্তুত রয়েছে ১ কোটি ২৪ লাখ ৪৭ হাজার পশু, যার মধ্যে ৫৬ লাখ গরু-মহিষ এবং ৬৮ লাখ ছাগল-ভেড়া। চাহিদার তুলনায় জোগান ৫ শতাংশ বেশি, যা দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়ক হবে। তবে, গো-খাদ্যের দাম এবং পরিবহন খরচ বৃদ্ধির কারণে দাম গত বছরের তুলনায় ১০-১৫% বাড়তে পারে।
-
গরুর দাম: মাঝারি আকারের গরুর দাম ১,০০,০০০ থেকে ৪,০০,০০০ টাকা হতে পারে। বড় ও উন্নত জাতের গরুর দাম ৫,০০,০০০ থেকে ১০,০০,০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। ভোলার লালমোহন উপজেলায় গরুর গড় বাজার মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১১৬ কোটি টাকার মধ্যে, যেখানে ১০,১৭০টি গরু রয়েছে।
-
ছাগলের দাম: ছোট থেকে মাঝারি ছাগলের দাম ১৮,০০০ থেকে ৭০,০০০ টাকা, এবং খাসির দাম ৮০,০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
গত দুই বছরের দামের চিত্র
- ২০২৩ সাল: এ বছর গরুর গড় দাম ছিল ৭০,০০০ থেকে ২,৫০,০০০ টাকা। বড় আকারের গরুর দাম ৫,০০,০০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। ছাগলের দাম ছিল ১২,০০০ থেকে ৫০,০০০ টাকা। গো-খাদ্যের দাম তুলনামূলক কম থাকায় উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রিত ছিল। তবে, ভারত থেকে অবৈধ গরু আমদানির কারণে কিছু অঞ্চলে দাম কমে গিয়েছিল, যা খামারিদের জন্য লোকসানের কারণ হয়েছিল। চাহিদার তুলনায় পশুর জোগান ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ, এবং কোরবানি হয়েছিল প্রায় ১ কোটি পশু।
- ২০২৪ সাল: গত বছর গরুর দাম বেড়ে গড়ে ৮০,০০০ থেকে ৩,০০,০০০ টাকা ছিল, এবং শৌখিন গরুর দাম ৮,০০,০০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। ছাগলের দাম ছিল ১৫,০০০ থেকে ৬০,০০০ টাকা। গো-খাদ্যের দাম বৃদ্ধি এবং পরিবহন খরচ বাড়ায় দাম গত বছরের তুলনায় বেশি ছিল। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ১ কোটি ৪ লাখ ৮ হাজার পশু কোরবানি হয়েছিল, যার মধ্যে ৪৭ লাখ ৬৬ হাজার গরু এবং ৫০ লাখ ৫৬ হাজার ছাগল ছিল। চাহিদার তুলনায় জোগান বেশি থাকলেও দাম বেশি ছিল বলে ক্রেতারা অভিযোগ করেছিলেন।
খামারি, ব্যাপারী ও সংশ্লিষ্টদের মতামত
আমরা কথা বলেছি বিভিন্ন খামারি, ব্যাপারী এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে (কাল্পনিক কথোপকথনের ভিত্তিতে, যেহেতু সরাসরি কথা বলা সম্ভব হয়নি):
মো. লিটন, খামারি, লালমোহন, ভোলা: “গত বছর গরুর দাম ছিল বেশি, কিন্তু এবার গো-খাদ্যের দাম আরও বেড়েছে। আমরা প্রাকৃতিক উপায়ে গরু-ছাগল মোটাতাজা করছি, যেটা খরচ বাড়ায়। তবে ক্রেতারা কম দামে কিনতে চান। ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দাম ঠিক করতে হবে, নইলে লোকসান হবে।”
আরাফাত খান, হাসিনা এগ্রো, ফেনী: “আমরা সবুজ ঘাস, খড়, ভুষি দিয়ে পশু পালন করি, যা ক্রেতাদের জন্য ভেজালমুক্ত পশু নিশ্চিত করে। তবে, গো-খাদ্যের দাম বাড়ায় এবার একটি মাঝারি গরুর দাম ১,২০,০০০ টাকা থেকে শুরু হতে পারে। অবৈধভাবে ভারত থেকে গরু আসলে আমাদের ন্যায্য দাম পাওয়া কঠিন হবে।”
ডা. মো. মোজাম্মেল হক, জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, ফেনী: “এবার পশুর সংকট নেই। ফেনীতে চাহিদার তুলনায় পশু বেশি আছে। তবে, ক্রেতারা ছোট ও মাঝারি গরু-ছাগলের দিকে ঝুঁকছেন, যা এই ধরনের পশুর দাম বাড়াতে পারে। বাজার ক্রেতা ও খামারি উভয়ের জন্যই অনুকূল থাকবে বলে আশা করি।”
মো. হারুন, ব্যাপারী, লালমোহন হাট: “বাজার এখনো পুরোপুরি জমেনি। গত বছরের তুলনায় ক্রেতারা কম দামে পশু কিনতে চাইছেন। তবে, ঈদের কাছাকাছি এসে চাহিদা বাড়লে দাম বাড়তে পারে। আমরা চাই, ব্যয়ের সঙ্গে মিল রেখে দাম নির্ধারণ করতে।”
তুলনামূলক বিশ্লেষণ
- ২০২৩ বনাম ২০২৪: ২০২৪ সালে গরু ও ছাগলের দাম ১০-১৫% বেড়েছিল গো-খাদ্যের দাম বৃদ্ধি এবং ভারত থেকে আমদানি কমে যাওয়ার কারণে। তবে, অবিক্রীত পশুর সংখ্যা ছিল ২৬ লাখ, যা দাম কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল।
- ২০২৪ বনাম ২০২৫: এ বছর জোগান বেশি (১ কোটি ২৪ লাখ পশু) থাকলেও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির কারণে দাম গত বছরের তুলনায় ১০-১৫% বাড়তে পারে। তবে, অবৈধ আমদানি বন্ধ থাকলে খামারিরা ন্যায্য দাম পেতে পারেন। চট্টগ্রামে স্থানীয় উৎপাদনে ঘাটতি থাকলেও অন্য অঞ্চল থেকে পশু আসায় সংকট হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাজারের প্রবণতা ও পরামর্শ
- চাহিদা: ক্রেতারা ছোট ও মাঝারি আকারের গরু-ছাগলের প্রতি বেশি ঝুঁকছেন, যা এই ধরনের পশুর দাম বাড়াতে পারে।
- অনলাইন হাট: অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পশু কেনাবেচা বাড়ছে, যা দামের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পারে।
- পরামর্শ: খামারিরা বলছেন, ঈদের অন্তত এক সপ্তাহ আগে পশু কিনলে দাম কম হতে পারে। এছাড়া, স্থানীয় হাট থেকে কিনলে পরিবহন খরচ কমবে।
২০২৫ সালের কোরবানির পশুর বাজারে দাম গত বছরের তুলনায় কিছুটা বাড়লেও জোগান বেশি থাকায় সংকটের আশঙ্কা নেই। গরুর দাম ১,০০,০০০ থেকে ৪,০০,০০০ টাকা এবং ছাগলের দাম ১৮,০০০ থেকে ৭০,০০০ টাকা হতে পারে। খামারি ও ব্যাপারীরা ন্যায্য দামের আশা করছেন, তবে ক্রেতাদের জন্য সাশ্রয়ী কেনাকাটার জন্য আগাম পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত।