বুধবার, মার্চ ১১, ২০২৬

দর্শনার্থী কম, আধুনিকায়ন নেই— চ্যালেঞ্জে জাতীয় জাদুঘর

by ঢাকাবার্তা
বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর

স্টাফ রিপোর্টার ।।

জাতীয় জাদুঘরের প্রতি দর্শনার্থীদের আগ্রহ দিন দিন কমে যাচ্ছে। দশ বছর আগেও যেখানে বছরে গড়ে ছয় লাখ মানুষ জাদুঘর পরিদর্শনে আসতেন, সেখানে করোনা-পরবর্তী সময়ে তা অনেকটাই কমে গেছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দর্শনার্থীর সংখ্যা ছিল ৬ লাখ ৩০ হাজার ৩৩ জন, আর ২০২০-২১ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় মাত্র ১ লাখ ১৪ হাজারে। গত অর্থবছরে দর্শনার্থীর সংখ্যা কিছুটা বেড়ে ৪ লাখ ৩৪ হাজার হলেও সামগ্রিক প্রবণতা নিম্নমুখী।

এমন প্রেক্ষাপটে আজ ১৮ মে পালিত হচ্ছে বিশ্ব জাদুঘর দিবস। দিবসটি উপলক্ষে রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরে আয়োজন করা হয়েছে শোভাযাত্রা, সেমিনার, বিশেষ প্রদর্শনী ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এবারের প্রতিপাদ্য—‘দ্রুত পরিবর্তনশীল সমাজে জাদুঘরের ভবিষ্যৎ’।

জাতীয় জাদুঘর কর্তৃপক্ষ দর্শকসংখ্যা হ্রাসের পেছনে করোনা মহামারি, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সড়ক অবরোধের মতো পরিস্থিতিকে দায়ী করলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন ভিন্ন কথা। জাদুঘর বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিচালনায় দক্ষ জনবলের অভাব, প্রদর্শনীর একঘেয়েমি, প্রচারের ঘাটতি এবং সমসাময়িক দর্শকদের আকর্ষণ করার মতো উদ্যোগের অভাব—এসবই প্রধান কারণ।

বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর

বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর

জাতীয় জাদুঘরের সচিব মো. সাদেকুল ইসলাম ও জনশিক্ষা বিভাগের কিপার আসমা ফেরদৌসী জানান, বর্তমানে জাদুঘরে ১ লাখ ১৯ হাজারের বেশি নিদর্শন সংরক্ষিত থাকলেও দর্শকদের জন্য প্রদর্শিত হয় মাত্র ৫ হাজারটি। গত বছর কিছু গ্যালারি নতুনভাবে সাজানো হয়েছে। ২৫ নম্বর গ্যালারিতে চিনামাটির সামগ্রী এবং ৪৬ নম্বর গ্যালারিতে পুতুল সংগ্রহ উপস্থাপন করা হয়েছে।

তবে আইকম বাংলাদেশের অনারারি চেয়ারপারসন ও জাদুঘরের সাবেক কিপার জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, “আধুনিকায়ন ছাড়া কোনোভাবেই দর্শনার্থী বাড়বে না। নিদর্শন উপস্থাপনা, সংরক্ষণ এবং ব্যবস্থাপনায় দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে হবে।”

শনিবার জাতীয় জাদুঘর ঘুরতে এসেছিলেন ময়মনসিংহ থেকে আসা জনতা ব্যাংকের কর্মকর্তা নুরুল মোমেন ও তাঁর স্ত্রী, উত্তরা ব্যাংকের কর্মকর্তা ফারিয়া আক্তার। সঙ্গে ছিলেন তাঁদের দুই শিশু সন্তান। চিকিৎসার প্রয়োজনে ঢাকায় এসে এক ফাঁকে তাঁরা জাদুঘর দেখতে যান।

নুরুল মোমেন বলেন, “দশ বছর আগে যখন এসেছিলাম, তখন যেমন ছিল, এখনো প্রায় তেমনই আছে। কোনো বিশেষ পরিবর্তন চোখে পড়েনি। বসার জায়গা খুব কম, বাচ্চাদের জন্য তেমন কিছু নেই। এত বড় জাদুঘর ঘুরে দেখলে ক্লান্ত লাগে।”

এখানেই থেমে থাকেননি তিনি। তাঁর ভাষায়, “আরেকটা কথা না বললেই নয়—শাহবাগ এলাকায় প্রায় সারা বছরই মিছিল, মিটিং, অবরোধ থাকে। আন্দোলন-সংগ্রামের কেন্দ্র বলেই অনেক সময় পরিবার নিয়ে এখানে আসতে ভয় লাগে। একদিক থেকে এটা আমাদের দুর্ভাগ্য যে, জাতীয় জাদুঘরের মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এমন একটা রাজনৈতিক উত্তেজনাপূর্ণ জায়গায় গড়ে উঠেছে।”

জাতীয় জাদুঘরের কার্যক্রম শুরু হয়েছিল ১৯১৩ সালে ঢাকায় ঢাকা জাদুঘর হিসেবে। পরে ১৯৮৩ সালে শাহবাগে বর্তমান ভবন নির্মাণের মাধ্যমে জাতীয় জাদুঘরের কার্যক্রম শুরু হয়। জাদুঘরের দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় রয়েছে ৪৬টি গ্যালারি।

জাদুঘরের সংগ্রহগুলো চারটি ভাগে উপস্থাপিত হয়েছে:

  • প্রাকৃতিক ইতিহাস বিভাগ: ভূতাত্ত্বিক নিদর্শন ও ভৌগোলিক উপাত্ত
  • জাতিতত্ত্ব ও অলংকরণ শিল্প: পোশাক, অলংকার, লোকসংস্কৃতি
  • ইতিহাস ও ধ্রুপদি শিল্প: প্রাচীন মূর্তি, মুদ্রা, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক স্মারক
  • সমকালীন শিল্প ও বিশ্বসাহিত্য: জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান, এস এম সুলতানসহ দেশ-বিদেশের শিল্পীদের চিত্রকর্ম

এ ছাড়া ষষ্ঠ-সপ্তম শতকের বিষ্ণু ও বুদ্ধমূর্তি, নবাব সিরাজউদ্দৌলার তরবারি, দুই লাখ বছরের পুরোনো গাছের জীবাশ্ম, দুষ্প্রাপ্য মুদ্রা ও কারুশিল্প এই জাদুঘরকে করেছে স্বতন্ত্র।

জাদুঘর পরিচালনার জন্য ছয়টি বিভাগ থাকলেও চারটিতে কিপার নেই। এসব বিভাগ চলতি দায়িত্বে পরিচালিত হচ্ছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে তিনজন সচিব ও পাঁচজন মহাপরিচালক পরিবর্তিত হয়েছেন। এখনো স্থায়ী মহাপরিচালক নেই। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ফরহাদ সিদ্দিক অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে প্রাত্যহিক প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে, উন্নয়নমূলক কাজও হচ্ছে না।

জাতীয় জাদুঘরের লোগো

জাতীয় জাদুঘরের লোগো

শুধু শাহবাগের জাতীয় জাদুঘর নয়, এর অধীনে থাকা অন্যান্য আঞ্চলিক জাদুঘরগুলোও চলছে একইভাবে। এর মধ্যে রয়েছে আহসান মঞ্জিল জাদুঘর, শহীদ জননী জাহানারা ইমাম স্মৃতি জাদুঘর, স্বাধীনতা জাদুঘর (বর্তমানে বন্ধ), চট্টগ্রামের জিয়া স্মৃতি জাদুঘর, সিলেটের ওসমানী স্মৃতি জাদুঘর, ময়মনসিংহের জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালা, ফরিদপুরের পল্লিকবি জসীমউদ্দীন জাদুঘর, কুষ্টিয়ার কাঙ্গাল হরিনাথ সংগ্রহশালা এবং কুমিল্লার নবাব ফয়জুন্নেসা স্মৃতি জাদুঘর।

এসব প্রতিষ্ঠানেরও একই দুরবস্থা—গতানুগতিক প্রদর্শনী, লোকবল সংকট ও আধুনিকায়নের অভাব।

You may also like

Publisher : Khaled Saifullah Jewel
Editor : Hamim Kefayat
15/1, Paridas Road, Banglabazar, Dhaka 1100, Bangladesh
Contact : +8801712813999,
Mail : news@dhakabarta.net