সাগর ইসলাম ।।
নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনে হিজাব পরা বা ইসলামপন্থি কোনো নারীর অনুপস্থিতি দেখে অসংখ্য মানুষ ক্ষোভ ও বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। এটি একেবারে স্বাভাবিক এবং কাঙ্ক্ষিত প্রতিক্রিয়া। বাংলাদেশের মুসলিম নারীদের একটি বড় অংশ হিজাব পরেন এবং ব্যক্তিগত জীবনে ধর্মীয় নীতিমালার অনুসরণ করে চলেন। কাজেই ক্ষোভ হোক বা বিরক্তি—এই বিরাট জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিয়ে যে আলোচনার সূত্রপাত হয়েছে, তা অত্যন্ত জরুরি এবং সময়োচিত।
নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন গঠিত হয়েছে ২০২৪ সালের ১৮ নভেম্বর। এটি কোনো গোপন প্রক্রিয়ায় হয়নি; বরং একটি সরকারি গেজেটের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। কমিশন ২০২৫ সালের ১৯ এপ্রিল প্রধান উপদেষ্টার কাছে তাদের সুপারিশমালা জমা দিয়েছে। মাঝখানের পাঁচ মাসে কারও টনক নড়েনি। যেদিন কমিশনের সদস্যরা প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে ফটোসেশনে অংশ নিলেন এবং তা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলো, সেদিনই যেন সবার ঘুম ভাঙল। যদিও দেরিতে, তবুও এই ঘুমভাঙাটা কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।
ক্ষোভ প্রকাশ করছেন মূলত ইসলামপন্থি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অনুসারীরা। তবে শুধু দলীয় পরিচয়ধারী নন, ব্যক্তিগত জীবনে ইসলামি মূল্যবোধ মেনে চলেন এমন অনেক মানুষও এই ক্ষোভে সামিল হয়েছেন।
ক্ষোভ প্রকাশ নিঃসন্দেহে একটি গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু ক্ষোভের পাশাপাশি আত্মসমালোচনার জায়গাটিও জরুরি। আগে নিজের অবস্থানটুকু খতিয়ে দেখা দরকার।
প্রাসঙ্গিক কিছু বিষয় উল্লেখ করা যাক। বাংলাদেশে রাজনৈতিক দল গঠনের আইনে বলা হয়েছে, প্রতিটি দলের নেতৃত্বে কমপক্ষে ৩৩% নারী অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে। এখন প্রশ্ন হলো—এই শর্ত কতগুলো ইসলামিক দল পূরণ করছে? এমন কোনো ইসলামিক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির ছবি কি দেখাতে পারবেন, যেখানে হিজাব পরা নারী পূর্ণ পর্দা মেনে বৈঠকে অংশ নিয়েছেন?
জামায়াতে ইসলামীর একটি নারী শাখা আছে, ছাত্রী শাখাও আছে। কিন্তু জামায়াতের বাইরে থাকা সাধারণ মানুষ সেই নারী বা ছাত্রী শাখার সভানেত্রী কিংবা সেক্রেটারির নাম জানেন কি? জাতীয় কোনো ইস্যুতে কখনও কি তাদের বক্তব্য শোনা গেছে? নারী-সংক্রান্ত কোনো বিষয়ের প্রতিক্রিয়াতেই বা কখনও কি তাদের দেখা গেছে?
অন্যান্য ইসলামিক দলগুলোর নারী শাখা আদৌ আছে কি না, সেটাও অস্পষ্ট। অথচ দেশে অসংখ্য মহিলা মাদ্রাসা রয়েছে। প্রতি বছর বহু নারী সেখান থেকে স্নাতক হচ্ছেন। এদের কেউ কেউ নিশ্চয়ই ধর্মীয় গ্রন্থে পারদর্শী, কেউ ভালো বক্তা, কেউবা ফিকহ শাস্ত্রেও দক্ষ। তবুও সমাজে সর্বজনপরিচিত কোনো নারী আলেমের নাম আমরা কি উল্লেখ করতে পারি?

সাগর ইসলাম
ইসলামপ্রিয় নারীদের নিজেদের পরিমণ্ডলেই যথেষ্ট স্থান দেওয়া হয় না। তাহলে কীভাবে আশা করা যায় যে রাষ্ট্র তাদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করবে? নিজেদের নারী বলে স্বীকার না করে ‘মহিলা’ বলেই সম্বোধন করেন, আর রাষ্ট্রের কাছে সমাদরের প্রত্যাশা করেন—এটা কি আত্মবিরোধিতা নয়?
রাষ্ট্রের কাছ থেকে ইনসাফ আশা করার আগে নিজেদের পরিমণ্ডলে নারীদের প্রতি ইনসাফপূর্ণ আচরণ জরুরি। সমাজে যদি নিজেদের পক্ষ থেকেই নারীদের সম্মান ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়, তাহলে রাষ্ট্র তাদের অবজ্ঞা করার সাহসই পাবে না।
লেখক : সমাজকর্মী ও সংগঠক
