হামীম কেফায়েত ।।
ঢাকার পরিবেশগত সংকট এখন আর কোনো গোপন বা অজানা অচেনা বিষয় নয়। বায়ুদূষণ, বৃক্ষ নিধন, নদী-খাল দখল, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিষাক্ত ধোঁয়া, আর শিল্পকারখানার অবৈধ নির্গমন শহরটিকে মৃত্যুকূপে পরিণত করছে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এয়ার পিউরিফায়ার স্থাপন, ছাদবাগানে ট্যাক্স ছাড়ের মতো উদ্যোগের ঘোষণা দিয়ে নাগরিকদের বিভ্রান্ত করছে। এসব প্রকল্প শুধু অকার্যকরই নয়, দূষণের মূল উৎসগুলোর দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে জনগণের সঙ্গে তামাশার একটি চতুর কৌশল বলে আমি মনে করি।
এয়ার পিউরিফায়ার: ব্যয়বহুল ও অকার্যকর প্রকল্প
ডিএনসিসির প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ ঘোষণা দিয়েছেন, ঢাকার ৫০টি স্থানে এয়ার পিউরিফায়ার স্থাপন করা হবে, যা প্রতি মিনিটে ৩০,০০০ ঘনফুট বায়ু পরিশোধন করতে পারবে এবং ১০০টি গাছের সমান কাজ করবে। এই প্রকল্পে বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতার কথা বলা হলেও, এর দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা ও টেকসইতা নিয়ে গবেষকরা স্পষ্ট সংশয় প্রকাশ করেছেন।
সমালোচনা:
- অকার্যকর ও সীমিত প্রভাব: বিশেষজ্ঞরা, যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবদুস সালাম, বলেছেন, এয়ার পিউরিফায়ার ঘনবসতিপূর্ণ শহরে সামগ্রিক বায়ুমান উন্নত করতে পারে না। এর প্রভাব কেবল সীমিত এলাকায়, যেমন ৫০-১০০ মিটারের মধ্যে। ভারতের দিল্লিতে ২০২১ সালে স্থাপিত স্মগ টাওয়ার ৫০ মিটারের মধ্যে ৭০-৮০% দূষণ কমালেও, ৩০০ মিটারের বাইরে এর কোনো প্রভাব ছিল না। দিল্লি দূষণ নিয়ন্ত্রণ কমিটি ২০২৩ সালে এটিকে অকার্যকর ও ব্যয়বহুল বলে ঘোষণা দিয়েছে। ঢাকার মতো শহরে, যেখানে দূষণের উৎস অগণিত, এমন প্রকল্প কেবল প্রচারমূলক হাস্যকরতা।
- ব্যয়ের অগ্রাধিকার: যদিও ডিএনসিসি দাবি করেছে, প্রাথমিকভাবে এই প্রকল্পে তাদের অর্থ খরচ হবে না, তবে রক্ষণাবেক্ষণ ও ভবিষ্যৎ খরচের বিষয়টি অস্পষ্ট। প্রতিটি এয়ার পিউরিফায়ারের ওজন ১,৫০০ কিলোগ্রাম এবং এটি চালাতে ২২০ ভোল্ট বিদ্যুৎ প্রয়োজন। এই বিদ্যুৎ খরচ ও ফিল্টার রক্ষণাবেক্ষণের খরচ কে বহন করবে? স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক আহমেদ কামরুজ্জামান বলেছেন, এয়ার পিউরিফায়ার এখনো মেডিকেল ইকুইপমেন্টের মতো, যা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে বৈষম্য সৃষ্টি করে। এই অর্থ দিয়ে বৃক্ষরোপণ, নদী উদ্ধার বা দূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যেত।
- মূল সমস্যার প্রতি উপেক্ষা: ঢাকার বায়ুদূষণের প্রধান উৎস হলো ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অবৈধ ইটভাটা, নির্মাণস্থলের ধুলা, এবং শিল্পকারখানার নির্গমন। আইকিউএয়ারের ২০২৪ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকা নগর হিসেবে বায়ুদূষণে তৃতীয় এবং বাংলাদেশ দেশ হিসেবে দ্বিতীয়। এই দূষণের মূল কারণগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ না নিয়ে এয়ার পিউরিফায়ারের মতো সাময়িক সমাধানে সম্পদ নষ্ট করা নাগরিকদের সঙ্গে প্রতারণা।
তথ্য-উপাত্ত: বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস) জানায়, গত ৯ বছরে ঢাকার মানুষ মাত্র ৩১ দিন নির্মল বাতাস পেয়েছে। ৮৫৩ দিন বাতাস ছিল অস্বাস্থ্যকর, ৬৩৫ দিন খুব অস্বাস্থ্যকর, এবং ৯৩ দিন দুর্যোগপূর্ণ। পিএম ২.৫-এর মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানের চেয়ে ২০.৪ গুণ বেশি। এই পরিস্থিতিতে এয়ার পিউরিফায়ারের মতো অকার্যকর প্রকল্পে বিনিয়োগের পরিবর্তে দূষণের উৎস বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ জরুরি।

এক রাতে রমনার সবুজ
ছাদবাগানে ট্যাক্স ছাড়: প্রলোভনমূলক ফাঁকি
ডিএনসিসি ঘোষণা দিয়েছে, ছাদবাগান বা আঙিনায় বাগান করলে ৫ শতাংশ ট্যাক্স ছাড় দেওয়া হবে। এই উদ্যোগ শুনতে পরিবেশবান্ধব মনে হলেও, এটি বৃক্ষ নিধন ও সবুজ ধ্বংসের মূল সমস্যা থেকে দৃষ্টি সরানোর একটি কৌশল।
সমালোচনা:
- মূল সমস্যার প্রতি উপেক্ষা: ঢাকার সবুজ এলাকা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। ২০২০ সালের একটি গবেষণা অনুযায়ী, গত ৩০ বছরে ঢাকার সবুজ এলাকা ২৫% থেকে কমে ৮% এ নেমেছে। শহরের বড় গাছ কাটা, পার্ক ও খেলার মাঠ ১৯৯০-এর দশকে ঢাকায় গাছপালা সমৃদ্ধ এলাকা ছিল শহরের মোট এলাকার প্রায় ১৪.৫৮%, কিন্তু ২০১০ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৮.৫৫%। উন্নয়ন প্রকল্প, রাস্তা সম্প্রসারণ, এবং অবৈধ দখলের কারণে বৃক্ষ নিধন অব্যাহত। এই পরিস্থিতিতে ছাদবাগানের প্রলোভন দিয়ে নাগরিকদের দায়িত্বে ঠেলে দেওয়া কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতাকে ঢাকার প্রচেষ্টা।
- সীমিত প্রভাব: ছাদবাগান শহরের তাপমাত্রা কিছুটা কমাতে পারে এবং সৌন্দর্য বাড়াতে পারে, কিন্তু এটি বায়ুদূষণ বা পরিবেশ ধ্বংসের বিরুদ্ধে কার্যকর সমাধান নয়। বড় গাছের তুলনায় ছাদবাগানের কার্বন শোষণ ক্ষমতা নগণ্য। একটি পরিপক্ক গাছ বছরে ২২ কিলোগ্রাম কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করতে পারে, যেখানে ছাদবাগানের ছোট গাছ বা ঘাস এর এক-দশমাংশও শোষণ করতে পারে না। শহরের ফুসফুস হিসেবে কাজ করা বড় সবুজ এলাকার বিকল্প হতে পারে না ছাদবাগান।
- বৈষম্য সৃষ্টি: ছাদবাগান করার সামর্থ্য সবার নেই। অধিকাংশ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের বাসা ভাড়া বা ফ্ল্যাটে, যেখানে ছাদে বাগান করার সুযোগ বা অনুমতি নেই। ফলে, এই ট্যাক্স ছাড়ের সুবিধা কেবল ধনী শ্রেণির জন্য, যা সামাজিক বৈষম্য বাড়ায়।
তথ্য-উপাত্ত: বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ অনুযায়ী, বৃক্ষ নিধনের জন্য অনুমতি প্রয়োজন, কিন্তু এই আইনের প্রয়োগ প্রায় নেই। ২০২২ সালে পরিবেশ অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকার আশেপাশে অবৈধভাবে প্রতি বছর হাজার হাজার গাছ কাটা হচ্ছে। অথচ, ছাদবাগানের মতো প্রকল্পে জনগণকে উৎসাহিত করে সরকার নিজের দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছে।
নাম পরিবর্তন: প্রকৃত সমস্যা থেকে দৃষ্টি সরানো
ডিএনসিসির ষষ্ঠ করপোরেশন সভায় বনানী, মধুবাগ, এবং কালশীতে কয়েকটি স্থাপনার নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগ পরিবেশ সংকটের প্রেক্ষাপটে একটি অপ্রাসঙ্গিক ও সময় নষ্টের কাজ।
সমালোচনা:
- অগ্রাধিকারের অভাব: যখন ঢাকার বায়ুমান অস্বাস্থ্যকর, নদী-খাল দখল হয়ে যাচ্ছে, এবং সবুজ এলাকা ধ্বংস হচ্ছে, তখন নাম পরিবর্তনের মতো প্রশাসনিক কাজে সময় ও শক্তি ব্যয় করা জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা। এই সময়ে সিটি করপোরেশনের মনোযোগ থাকা উচিত ছিল দূষণ নিয়ন্ত্রণ, সবুজায়ন, এবং অবৈধ দখল উচ্ছেদে।
- প্রচারমূলক রাজনীতি: নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক প্রচারণা হিসেবে দেখা যায়। পূর্ববর্তী সরকারের নামকরণ মুছে ফেলার এই প্রচেষ্টা জনগণের জীবনমান উন্নয়নে কোনো অবদান রাখে না। বরং, এটি প্রশাসনের অক্ষমতা ও অগ্রাধিকারের অভাবকে প্রকাশ করে।
- সম্পদের অপচয়: নাম পরিবর্তনের জন্য সাইনবোর্ড, নথিপত্র, এবং প্রচারণার খরচ হয়। এই অর্থ পরিবেশ রক্ষার কাজে ব্যবহার করা যেত। উদাহরণস্বরূপ, একটি নতুন পার্ক তৈরি বা নদী উদ্ধারে এই অর্থ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারত।
তথ্য-উপাত্ত: ২০২৩ সালে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বেলা) জানায়, ঢাকার চারপাশের নদী ও খালের ৬০% অবৈধ দখলের কবলে। এই পরিস্থিতিতে নাম পরিবর্তনের মতো কাজে সম্পদ ব্যয় করা জনগণের প্রতি দায়িত্বহীনতা।
সিটি করপোরেশনের জন্য প্রস্তাবিত পথ
ঢাকার পরিবেশ সংকট মোকাবিলায় ডিএনসিসিকে অবশ্যই মূল সমস্যার দিকে মনোযোগ দিতে হবে। নিচে একটি টেকসই ও কার্যকর পরিকল্পনা প্রস্তাব করা হলো:
দূষণের উৎস নিয়ন্ত্রণ:
- ফিটনেসবিহীন যানবাহন নিয়ন্ত্রণ: বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ)-এর সঙ্গে সমন্বয় করে ফিটনেসবিহীন যানবাহন শনাক্ত ও বাজেয়াপ্ত করতে হবে। বৈদ্যুতিক বাস ও সাইকেল লেন চালু করা যেতে পারে।
- ইটভাটা ও কারখানা নিয়ন্ত্রণ: অবৈধ ইটভাটা বন্ধ এবং শিল্পকারখানায় ফিল্টার স্থাপন বাধ্যতামূলক করতে হবে। পরিবেশ অধিদপ্তরের তদারকি জোরদার করতে হবে।
- নির্মাণস্থলের ধুলা নিয়ন্ত্রণ: নির্মাণস্থলে জল ছিটানো, ধুলা বন্ধে বাধা দেওয়া, এবং কঠোর জরিমানার ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
সবুজায়ন ও বৃক্ষরোপণ:
- বড় আকারের সবুজায়ন: শহরের পতিত জমি, পার্ক, এবং রাস্তার পাশে বড় গাছ রোপণ করতে হবে। স্থানীয় প্রজাতির গাছ, যেমন বট, অর্জুন, বা আম, বেশি কার্বন শোষণ করে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে এই প্রকল্প চালানো যেতে পারে।
- বৃক্ষ নিধনের বিরুদ্ধে আইন: বৃক্ষ নিধনের জন্য কঠোর শাস্তি ও অনুমতি প্রক্রিয়া কঠোর করতে হবে।
নদী-খাল উদ্ধার:
- দখল উচ্ছেদ: নদী ও খালের অবৈধ দখল উচ্ছেদে টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, এবং বালু নদীর দখলমুক্তকরণে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
- পানি শোধন: নদীতে বর্জ্য ফেলা বন্ধে কারখানাগুলোর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
বায়ুমান পর্যবেক্ষণ:
- মনিটরিং স্টেশন: ঢাকার বিভিন্ন স্থানে বায়ুমান পর্যবেক্ষণ স্টেশন স্থাপন করতে হবে। এই তথ্য জনগণের কাছে স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করতে হবে।
- জনসচেতনতা: স্কুল, কলেজ, এবং মিডিয়ার মাধ্যমে বায়ুদূষণের ক্ষতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে।
নীতি ও সমন্বয়:
- পরিবেশ নীতি: পরিবেশবান্ধব নগর পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। উচ্চ ভবন নির্মাণে সবুজ ছাদ বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।
- আন্তঃসংস্থা সমন্বয়: পরিবেশ অধিদপ্তর, বিআরটিএ, এবং স্থানীয় সরকারের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করতে হবে।
ঢাকার পরিবেশ সংকট আর অগ্রাহ্য করার সুযোগ নেই। এয়ার পিউরিফায়ার, ছাদবাগানে ট্যাক্স ছাড়, বা নাম পরিবর্তনের মতো উদ্যোগ শুধু সময় ও সম্পদের অপচয়ই নয়, নাগরিকদের সঙ্গে প্রতারণা। ডিএনসিসির উচিত দূষণের উৎস বন্ধ, বৃক্ষরোপণ, নদী উদ্ধার, এবং কঠোর আইন প্রয়োগে মনোযোগ দেওয়া। এই পথ কঠিন, কিন্তু এটিই একমাত্র টেকসই সমাধান। নইলে, ঢাকা কেবল বায়ুদূষণের রাজধানীই নয়, অবাসযোগ্য শহরে পরিণত হবে। এখনই সময়, প্রতারণার প্রলেপ সরিয়ে প্রকৃত পদক্ষেপ নেওয়ার।
লেখক : ঢাকাবার্তার সম্পাদক ও স্রোতের নির্বাহী পরিচালক
