মামুনুল হক: ধন্যবাদ আপনাকেও। আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ ভালো রেখেছেন।
প্রশ্ন: জনাব মামুনুল হক, শুরুতে আপনার রাজনৈতিক আদর্শটা বুঝে তারপর আলোচনাটা করতে যাচ্ছিলাম। তা আমি আপনাদের যে ওয়েবসাইট আছে, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, সেখানে আমি দেখলাম আপনাদের দলটি ১৯৮৯ সালে তৈরি এবং সেখানে ইতিহাস ও ঐতিহ্যতে লেখা আছে যে, ইসলামিক সমাজ ব্যবস্থার অনুপস্থিতিতে সৃষ্ট নৈরাজ্য হতাশার বিপরীতে বাংলার জমিনে আল্লাহর খেলাফত প্রতিষ্ঠার এক আপোষহীন আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যে এ দলটির পথচলা শুরু হয়। যার আদর্শ এবং উদ্দেশ্যতে আছে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে দুনিয়া এবং আখেরাতের মুক্তি ও প্রকৃত কল্যাণ লাভের উপায় হিসেবে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস প্রচলিত অনৈসলামী সমাজ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন সাধন করে কুরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে এবং খেলাফতের আছাতে, মানে খুলাফায়ে রাশিদীনের দৃষ্টান্তের অনুসরণে প্রথমে বাংলাদেশে একটি ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা তথা আল্লাহর খেলাফত প্রতিষ্ঠা এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে সমগ্র দুনিয়া আল্লাহর খেলাফত প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত করতে চায়। তো বাংলাদেশে এখন যেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা রয়েছে, তার সাথে আপনার বা আপনার দলের রাজনৈতিক বিশ্বাস সাংঘর্ষিক কিনা। কেননা বাংলাদেশের সংবিধানে তো রাষ্ট্র ক্ষমতার একমাত্র উৎস হিসেবে জনগণকে স্বীকৃতি দেয়, যেইটা শরীয়াহভিত্তিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা দেয় না। তাহলে কিভাবে রাজনীতিটা আপনারা করবেন বা করছেন?
উত্তর: এ প্রশ্নটা তো বেশ একটা অনেক গভীর প্রশ্ন, বেশ এবং লম্বা দীর্ঘ একটা উত্তরের এটা প্রয়োজন। নাহলে বিষয়টা আমি এরপরও চেষ্টা করছি যতটা সংক্ষেপে বলা যায়। দেখেন প্রথম বিষয় হলো, যে ইসলাম এবং ঈমান। আমরা যেহেতু মুসলিম পরিচয় দেই, ঈমান পরিচয় দেই, আমি মনে করি আমার কারো কোন ব্যক্তিরই যারা ঈমান পরিচয় দিবে, মুমিন পরিচয় দিবে, এখানে কোন শঠতা এবং এখানে কোন ধরনের খুণিতা থাকার কোন সুযোগ নেই। আমি মুমিন দ্যাট আমি ইসলামকে বিশ্বাস করি, কোরআনকে বিশ্বাস করি এবং আল্লাহর সার্বভৌমত্ব বা আল্লাহর যে সর্বময় ক্ষমতার যে মালিক আল্লাহ এই বিশ্বাসকে আমাকে ধারণ তো করতে হবে, নলে আমি আসলে মুমিন থাকতে পারিনা। এটা হলো প্রথম বিষয়। দ্বিতীয় বিষয় হলো আল্লাহপাক রব্বুল আলামিন মানুষকে দুনিয়ার মানুষকে একটা পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা দিয়েছেন, কোরআনের মাধ্যমে, নবীজির মাধ্যমে। সেটাই হলো ইসলাম। এবং সেই ইসলাম একটা যেহেতু পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা। কাজেই সেখানে রাষ্ট্র রাজনীতি তার একটা অপরিহার্য অনুষঙ্গ। এটাকে বাদ দিয়ে মানুষের জীবন ব্যবস্থা পূর্ণ হতে পারে না। এটা দুই নম্বর কথা। আল্লাহর দেওয়া সেই পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থাটার নামই হলো শরীয়াহ, ইসলামী শরীয়াহ। আচ্ছা। এরপরে সেটা হলো, যে সেটা বাস্তবায়ন করার যে পদ্ধতি ইসলামে, সেটাই হলো খেলাফত। সেটাই হলো খেলাফত ব্যবস্থা। খেলাফত ব্যবস্থার মূল কনসেপ্টটা হলো, যে শাসক যিনি হবেন তিনি আল্লাহর প্রতিনিধি। আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে জনগণকে তিনি শাসন করবেন।
প্রশ্ন: সেটা মজলিসে শুরা ডিসাইড করবে?
উত্তর: সেটা যেটাই হোক। না মানে, মজলিসে শুরা ডিসাইড করবে তো ভিন্ন আরেকটা প্রক্রিয়া। আমি আসছি আলোচনায় আসছি। মানে খেলাফত মানে এটা কি? খেলাফত মানে হলো, যে মূল ক্ষমতার মালিক হলেন আল্লাহ। এবং যেটা কোরআনে জায়গায় জায়গায় আল্লাহ বলেছেন, ‘আল্লাহুম্মা মালিকাল মুল্ক’। তিনি হলেন রাজত্বের মালিক। তিনি জগতের মালিক। এবং সেখানে যিনি শাসক হবেন, তিনি আল্লাহর প্রতিনিধি। আল্লাহর প্রতিনিধি হওয়ার অর্থটা কি? আল্লাহর প্রতিনিধি হওয়ার অর্থ হলো রুলসটা আল্লাহ দিবেন, আইনটা আল্লাহ দিবেন, শাসক তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে সেটা মানুষের উপর প্রয়োগ করবেন, জনগণের কল্যাণ করবেন। এই হলো ইসলামী শাসন থেকে যার। এখন এখানে প্রশ্নটা হলো যে, একজন শাসক নির্বাচন নির্বাচিত হবে কিভাবে? একজন শাসক নির্বাচিত হবে কিভাবে এটা একটা প্রক্রিয়ার বিষয়। ইসলাম সেখানে একটা প্রক্রিয়া দিয়েছে। যে এই প্রক্রিয়ায় শাসক নির্বাচিত হবে। যেমন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনি শাসক নির্বাচিত হয়েছেন একটা প্রক্রিয়ায়। নবীজির পরে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু তিনি শাসক নির্বাচিত হয়েছেন আরেকটা প্রক্রিয়ায়। হযরত ওমর নির্বাচিত হয়েছেন একটা প্রক্রিয়ায়। হযরতে উসমান পরবর্তী শাসকগণ নির্বাচিত হয়েছেন আরেকটা একটা প্রক্রিয়ায়। এটা হলো ইসলাম প্রদত্ত একটা প্রক্রিয়া। আচ্ছা। এখন গণতন্ত্রের যেই জায়গাটার সাথে ইসলামের এই কিছু সাংঘর্ষিকতা, কিছু সমন্বয় এই জায়গার প্রশ্নগুলো খোলাসা করা দরকার। অনেকে ঢালাওভাবে গণতন্ত্রকে মানে ইসলামিকরণ করার চেষ্টা করে। আবার অনেকে ঢালাওভাবে গণতন্ত্রের প্রত্যেকটা বিষয়কেই ইসলামের সাথে কন্ট্রাডিক্টেড সাব্যস্ত করার চেষ্টা করে। এই কোনোটাই আসলে সঠিক চিন্তা না। গণতন্ত্রের মধ্যে একটা জায়গা আছে, বিশ্বাসের জায়গা। আরেকটা আছে, শাসক নির্বাচনের প্রক্রিয়া। গণতন্ত্রের যে বিশ্বাসের জায়গাটা, সেটা কিন্তু ইসলামের ঈমানের বিশ্বাসের সাথেই কন্ট্রাডিক্টেড। যে অর্থাৎ মানুষ আল্লাহর আইনকে উপেক্ষা করে নিজেরা আল্লাহর বিরুদ্ধে আইন তৈরি করার ক্ষমতা রাখে কিনা। এটা বেসিক প্রশ্ন এখানে।
প্রশ্ন: আচ্ছা।
উত্তর: যে মুমিন যে আল্লাহকে বিশ্বাস করে, সে তো আল্লাহর ক্ষমতাকেও বিশ্বাস করতে হবে। শুধু আল্লাহর অস্তিত্বকে বিশ্বাস করার দ্বারা একজন মানুষ কিন্তু ঈমানদার হতে পারে না। আল্লাহকে বিশ্বাস করার অর্থ হলো আল্লাহর ক্ষমতাকেও বিশ্বাস করা। অর্থাৎ আল্লাহকে চ্যালেঞ্জ করার ক্ষমতা পৃথিবীর কোন মানুষ রাখে না। এই বিশ্বাস না করলে কোন মানুষ ঈমানদার মুমিন মুসলিম হতে পারে না। তো যারা আল্লাহর এই আনচ্যালেঞ্জেবল ক্ষমতাকে যে বিশ্বাস করে না কিন্তু নিজেকে মুমিন বলে পরিচয় দেয়, সে কিন্তু একেবারেই শর্ট। সে একেবারেই একজন প্রতারক মানুষ, ভণ্ড মানুষ। কারণ সে ইসলামকে, ঈমানকে বিশ্বাস করছে না কিন্তু আবার নিজে মুমিন মুসলিম পরিচয় ধারণ করছে। তো কাজেই প্রথম কথা হলো, বিশ্বাসের জায়গাটা থেকে যদি একজন মুমিন নিজেকে মুমিন বলে দাবি করে, মুসলিম বলে দাবি করে, তাহলে তাকে এই জায়গাটা বিশ্বাস করতেই হবে যে আল্লাহ যে আইন তৈরি করার, যে আল্লাহর যে ক্ষমতা, সেই ক্ষমতা আনচ্যালেঞ্জেবল। অন্য কেউ এটাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারবে না এবং আল্লাহর আইনের বিপরীত কোন আইন তৈরি করতে পারবে না। এটা হলো ইসলামের বিশ্বাসের জায়গা। তো গণতন্ত্রের বিশ্বাসের এই জায়গাটা ইসলামের সাথে কন্ট্রাডিক্টেড।
প্রশ্ন: আচ্ছা।
উত্তর: আচ্ছা। বাট যে নির্বাচনের যে প্রক্রিয়া, এটা একটা সাময়িক বিষয়। যে নির্বাচন প্রক্রিয়া শাসক কিভাবে নির্বাচিত হবে? গণতন্ত্র বলছে, মাস্ট পিপল বা ম্যাক্সিমাম পিপল যাকে চাইবে সেই শাসক নির্বাচিত হবে। ইসলাম এইটাকে আরেকটু ছোট করে আনে। একেবারে সকল জনগণের নির্বিশেষে বুদ্ধিমান, অবুঝ, বুঝমান।
প্রশ্ন: আলেমরাই নির্ধারণ করবে?
উত্তর: না না, আলেমরাই না, আলেমরাই না। এই কথাটা, এটা ধারণাটাও ঠিক না। যে আলেমরাই নির্ধারণ করবে না। ইসলাম বলে যে, শাসক নির্ধারণ বা নির্বাচন করার ক্ষমতা তাদেরই, যারা একজন শাসকের ভালো-মন্দ অন্তত যাচাই করতে পারে।
প্রশ্ন: আচ্ছা।
উত্তর: এই জাতীয় কিছু ক্রাইটেরিয়ার ভিত্তিতে।
প্রশ্ন: মানে ন্যূনতম সে নলেজটা থাকবে?
উত্তর: ন্যূনতম তার নলেজটা থাকতে হবে, ন্যূনতম তার মধ্যে সেই আমানতদারী থাকতে হবে। যে লোকটা পাঁচ হাজার টাকা খেয়ে দশ হাজার টাকার জন্য একটা লোককে ভোট দিবে, সে অনৈতিকভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করবে। এই জাতীয় অনৈতিক লোক সে ভোট দিতে পারে না। এটাকে তাকে এই জায়গাটা উত্তীর্ণ হতে হবে। ইসলাম শুধু জাস্ট এই ধরনের বেসিক কিছু কনসেপ্ট দিয়েছে।
উত্তর: যে কারা শাসক নির্বাচিত।
প্রশ্ন: সেখানে তো জনগণের বাইয়াতেরও প্রয়োজন, মানে সম্মতির প্রয়োজন।
উত্তর: হ্যাঁ, সেটা তো পরের বিষয়।
প্রশ্ন: আচ্ছা।
উত্তর: আগে শাসক নির্বাচিত হবে, শাসক ঘোষিত হবে। এরপর জনগণ প্রত্যেক যখন শাসক নির্বাচনটা বৈধ হয়ে যাবে ইসলামের দৃষ্টিতে, তখন জনগণ তাকে বাইয়াত দিতে বাধ্য। এটা হলো ইসলামের নির্বাচন পদ্ধতি। এবং নির্বাচন পদ্ধতিতে আমি যেটা বলি, গণতন্ত্রের যে যেই মূল একটা প্রশ্ন আছে, যে গভর্নমেন্ট বাই দ্য পিপল। তো ইসলাম বলে বাই দ্য সিলেক্টেড পিপল। জাস্ট শুধু এতটুকু।
প্রশ্ন: পরিষ্কার।
উত্তর: যে সকলের দ্বারা না, মানে যে যারা ন্যূনতম নৈতিকতার মানে এবং ন্যূনতম জ্ঞান যারা আছে, যে একজন ভালো শাসককে খারাপ শাসক থেকে, ভালো মানুষকে খারাপ মানুষ থেকে পার্থক্য যে করতে পারে, সে ভোটাধিকার প্রয়োগ করবে। তো এই জায়গাটা কিন্তু গণতন্ত্রের সাথে যে ইসলামের যে পার্থক্যটা, সেটা কিন্তু কোন বিশ্বাসের পার্থক্য না, সেটা একটা প্রক্রিয়ার পার্থক্য।
প্রশ্ন: আচ্ছা।
উত্তর: তো কাজেই আমরা যেটা মনে করি যে, যেহেতু বর্তমানে বাংলাদেশে তো ইসলামিক পদ্ধতি কার্যকর নেই। এখন যে পদ্ধতিটা কার্যকর আছে, এই পদ্ধতিটাকে আমরা অনুসরণ করতে বাধ্য। প্রসেসিং এর প্রসেসের কারণে। কাজেই আমরা যেই পদ্ধতিতে অনুসরণ করতে আমরা এখন বাধ্য, সেটার মধ্য থেকেই আমরা চেষ্টা করছি যেন আমাদের বিশ্বাসের জায়গাটা আমরা যেটা বিশ্বাস করি, সেটা যেন প্রতিষ্ঠা করতে পারি।
প্রশ্ন: অনেকেরই আসলে প্রশ্ন আপনাদেরকে নিয়ে যে আপনারা ক্ষমতায় গেলে কি কি করবেন? যেমন ইসলামে তো বাদ্যযন্ত্র সহ গান-বাজনা নিষিদ্ধ রয়েছে। তো যারা সেই রকমের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন, যারা সিনেমা নাটকে অভিনয় করেন, যারা রবীন্দ্র সংগীত গেয়ে নজরুল সংগীত গেয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন, যারা পহেলা বৈশাখ উদযাপন করেন যেখানে ভাস্কর্য রয়েছে, যে ভাস্কর্যের ব্যাপারে ইসলামের বিধিনিষেধ রয়েছে। কিংবা যেই নারী ধরেন ওয়েস্টার্ন ড্রেস পরে রাস্তায় বের হয়। তাদের ক্ষেত্রে আপনারা কি করবেন?
উত্তর: দেখেন ইসলাম এমন একটা সমাজ ব্যবস্থা দেয়, যেখানে হুট করেই যেকোনো বিধান বাস্তবায়ন করার বিষয় না। ইসলাম প্রত্যেকটা বিধানকে যেরকম দিয়েছে, সেই বিধান বাস্তবায়ন করার পদ্ধতি সেটাও দিয়েছে ইসলাম। যেরকম ধরেন ইসলামে মদ্যপান করা হারাম। কিন্তু এই মদ্যপান করাটাকে একদিনেই ইসলাম হারাম করেনি। ধাপে ধাপে ধাপে ধাপে মানুষকে সেই জায়গাটা থেকে উঠিয়ে এনেছে, যেই সমাজ মদ্যপানে অভ্যস্ত ছিল, তারা যেন মদ্যপান ত্যাগ করেও সেই সমাজ যেন বেঁচে থাকতে পারে, সেই সময়টুকু তাদেরকে দেওয়া হয়েছে। ইসলাম চুরি করার বিধান দিয়েছে, কিন্তু প্রথম দিনই একটা মানুষ চুরি করেছে, হাত কেটে দিয়েছে, বিষয়টা কিন্তু এরকম না, যে এভাবে ভুলভাবে রিপ্রেজেন্ট করা হয় ইসলামকে। তো আমি মনে করি যে, আমাদের সমাজে আমরা কিন্তু এখনই এক ধাপেই ইসলামের সকল বিধান বাস্তবায়ন করতে পারবো বা করে ফেলবো, সেটা কিন্তু আমরা মনে করি না। আমরা মনে করি আগে তো আমাকে প্রত্যেকটা মানুষকে যেখানে যেই জায়গাটা সে এখন কাজ করছে, সেই জায়গা থেকে তাকে ইসলামের আদর্শের দিকে তাকে অনুপ্রাণিত করতে হবে, উৎসাহিত করতে হবে, উদ্বুদ্ধ করতে হবে এবং প্রত্যেকের জন্য অল্টারনেটিভ সোর্স আমাকেই সৃষ্টি করতে হবে রাষ্ট্রকে। এবং সেই সকল সোর্স সৃষ্টি করে তারপরে যতটুকু জায়গায় রাষ্ট্রীয় শক্তি প্রয়োগ করার সুযোগ আছে, ততটুকু জায়গায় রাষ্ট্র বিধিনিষেধ আরোপ করবে। আর যেখানে কখনোই রাষ্ট্রকে ইনভল্ভ বা সেখানে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ দেয়নি, সেখানে ইসলাম শুধুমাত্র মানুষকে উৎসাহই দিবে, সেখানে কখনোই আইন প্রয়োগ করবে না। এগুলো ধাপে ধাপে সবই বাস্তবায়ন। আমরা মনে করি না যে ইসলাম অপ্রয়োজ্য কোন ব্যবস্থা। আমরা মনে করি যে ইসলাম সম্পূর্ণই সকল ক্ষেত্রে, সব পরিবেশে, সব জায়গাতে, সব জাতির উপরই প্রয়োগযোগ্য এবং সবচেয়ে আধুনিক জীবন ব্যবস্থার নাম হলো ইসলাম।
প্রশ্ন: কাজেই ধরুন আমি হাইপোথেটিক্যাল একটু জিজ্ঞাসা করি। আপনি হেদায়েতের ডাক দিলেন, তাদেরকে ইসলামের পথে আনার চেষ্টা করলেন, পূর্ণাঙ্গ ইসলামী জীবন ব্যবস্থার প্রতি তাদেরকে আহ্বান জানালেন। এখন হেদায়েতের মালিক তো আল্লাহ, তাদের হয়তো হেদায়েত হলো না, যেরকম মহানবীও ডাক দিয়েছিলেন হয়নি অনেকের। তখন তারা কোথায় যাবে? তারা কি এই রাষ্ট্র থাকতে পারবে?
উত্তর: না তারা সব কাজ ব্যক্তিগত সমস্ত কাজের উপরও তো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয় না। যেই কাজের দ্বারা সমাজ মানে এফেক্টেড হয়, সেই কাজগুলোকেও প্রকাশ্যরূপে করতে নিষেধ করা হয়। কোন ব্যক্তি যদি তার ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে এমন কিছু কাজ করে, যেইটা আল্লাহর নবী বলেছেন, যে প্রত্যেক মানুষের ঘরে ঘরে গিয়ে তদন্ত করে অথবা প্রত্যেক মানুষের অন্তরের মধ্যে কি আছে, সেই জায়গা পর্যন্ত মানুষের অন্তর থেকে তার অবস্থা বের করে এনে বিচার করার দায়িত্ব তো আমার না। আমার দায়িত্ব হলো ওভারঅল সমাজটাকে একটা সুন্দর পরিবেশ রক্ষা করা। সেটাই আমি।
প্রশ্ন: এখন কোন নারী যদি ওয়েস্টার্ন ড্রেস পরে পাবলিক স্পেসে যেতে চাই সে কি করবে?
উত্তর: না তাকে ইসলামের যে ড্রেস কোড আছে, সেই ড্রেস কোড অনুসরণ করতে তাকে উৎসাহিত করা হবে। এর চেয়ে বেশি তো ইসলাম বাধ্য করে নাই।
প্রশ্ন: আচ্ছা। আপনাদের দলে কি কোন নারী বা সংখ্যালঘু প্রার্থী আছেন কিনা?
উত্তর: না এই মুহূর্তে আমাদের দলের প্রার্থী খুব কম। সংখ্যালঘুও প্রার্থীও নাই, নারী প্রার্থীও নাই।
প্রশ্ন: কিন্তু ধরেন নারীরা বাংলাদেশের প্রায় অর্ধেক। তো একটা বিশাল বড় জনগোষ্ঠীকে আপনারা বাদ রাখছেন না?
উত্তর: আমরা বাদ রাখছি না। আমাদের নারীদের নেতৃত্বের জায়গাটা আমরা ভিন্নভাবে চিন্তা করি।
প্রশ্ন: মানে আপনারা কি নারীদের নেতৃত্বে বিশ্বাস করেন কিনা?
উত্তর: নারীদের নেতৃত্বে দুইটা প্রশ্ন। একটা হলো নারীর মূল নেতৃত্বে। মূল।
প্রশ্ন: ধরেন এমপি হতে পারবে কিনা?
উত্তর: হ্যাঁ, এমপি হতে পারবে। এমপি হতে পারবে, এমপি হওয়া মানে হলো ফুল যে পরামর্শ বডির একজন মেম্বার হওয়া। তো পরামর্শ বডির মেম্বার নারী হওয়ার মধ্যে কোন আপত্তি ইসলামের নেই।
প্রশ্ন: আচ্ছা, পরিষ্কার। এই শরীয়াহ ভিত্তিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রবর্তন করা এইটা তো ফরজে কেফায়া?
উত্তর: ফরজে কেফায়া আর ফরজে আইনের যে পার্থক্যটা, সেটা কী? সেটা হলো যে কোন একটা বিষয় যখন ফরজ হয়, তখন কিছু বিষয় আছে যে যেটাকে ফরজে কেফায়া। ফরজে কেফায়ার অর্থ হলো…
প্রশ্ন: গোষ্ঠীগতভাবে?
উত্তর: না। ফরজে কেফায়ার অর্থ হলো যেই কাজটা যতগুলি মানুষ মিলে করলে হয়ে যায়, সেই পরিমাণ মানুষ যদি সেটাতে পার্টিসিপেট করে, তাহলে আদায় হয়ে যাবে। আর সেই পরিমাণ মানুষ এটাতে পার্টিসিপেট করার আগ পর্যন্ত সবার জন্য এটা ফরজে আইন থাকে। যেমন ধরেন, জানাজার নামাজ এটা হলো একটা খুব সহজ উদাহরণ ফরজে কেফায়ার। জানাজার নামাজে জামাতের সাথে নামাজটা পড়তে হবে। দ্যাট মিনস মিনিমাম তিনজন মানুষ জানাজায় শরিক হইতে হবে। একজন মানুষ যদি মারা যায়। এখন যদি তিনজন মানুষ না হয়, তিনজন মানুষ যদি না হয় আর যদি জানা এই লোকটাকে যদি এভাবেই জানাজা না পড়ে দাফন করা হয় যে, তিনজন মানুষও তার জানাজা পড়েনি। এটা কিন্তু ফরজে কেফায়া। কিন্তু যখন তার জানাজাটা পড়া হলো না, এই যে ফরজটা যে তরক হলো, এর গুনাহটা কিন্তু সবার হবে, ওই গোষ্ঠীর সবার। এরকম না যে, এটা তো তিনজনের উপর ফরজ ছিল। তো এখন গুনাহটা দশ হাজার মানুষের হবে কেন? পাপটা দশ হাজার মানুষের হবে কেন? কিন্তু তিনজন মানুষ তো হয় নাই। তো এই তিনজন মানুষকে তো ইসলাম নির্ধারণ করেনি যে, ওই তিনজনের উপর ফরজ। এই দশ হাজার থেকে যে কোন তিনজন যদি আদায় করে, তাহলে বাকি নয় হাজার নয়শো সাতানব্বই জন পরিত্রাণ পাবে। কিন্তু যদি কোন তিনজনও আদায় না করে, তাহলে দশ হাজার মানুষ সবাই সমান হারে গুনাহগার হবে। তো যেটাই ফরজে কেফায়া হয়, শরীয়াহ আইন বাস্তবায়ন করা, ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা ফরজে কেফায়া ধরে নিলাম। ফরজে কেফায়ার জন্য যে কোন প্রক্রিয়া থাকবে, সেই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যতক্ষণ পর্যন্ত ফরজে কেফায়াটা বাস্তবায়িত না হচ্ছে, সকল মুসলিমরাই তখন সেটার জন্য দায়ী থাকবে।
প্রশ্ন: পরিষ্কার। আমি এই ইসলামী শাসন ব্যবস্থা নিয়ে পরবর্তীতে আবার প্রশ্ন করব। একটু বর্তমান রাজনীতিতে চলে আসতে যাচ্ছিলাম। আসন সমঝোতার চেষ্টা করছে জামাত। আপনাদের সাথেও করছে, ইসলামী আন্দোলনের সাথেও করছে, এনসিপির সাথেও করছে। আবার এর মধ্যে শোনা যাচ্ছে যে, ইসলামী আন্দোলনের মনোপূত হচ্ছে না। আপনাদের সাথেও সম্ভবত নেগোসিয়েশন এখনো শেষ হয়নি। কোন পর্যায়ে এখন আছে? এবং ধরেন আপনারা সাপোস, হাইপোথেটিক্যালি ধরে নিচ্ছি, আপনারা ৩০টা বা ৩৫টা আসন চাইলেন। জামাত বলল না, আমরা ১৫টার বেশি দিতে পারবো না। তখন আপনারা কি করবেন?
উত্তর: আমি প্রথমে আপনাকে একটা কারেকশন দিচ্ছি। সেটা হলো, জামাত চাচ্ছে বিষয়টা আদৌ এমন না। এখানে শুধু জামাতের চাওয়ার বিষয় না। আমরা বারবার এটা পরিষ্কার করছি যে, এখানে আমরা তো কোন জোট করছি না। আমরা একটা নির্বাচনী সমঝোতা করছি। এ নির্বাচনী সমঝোতায় কোন একক ব্যক্তির নেতৃত্ব বা কোন দলের নেতৃত্ব এখানে সেভাবে প্রতিষ্ঠিত না। এখানে আমরা বাংলার আগামী বাংলাদেশ সুন্দরভাবে গঠন করার জন্য জুলাই বিপ্লবকে সত্যিকার অর্থে অর্থবহ করার লক্ষ্যে আমরা একটা জোটবদ্ধতার বা ঐক্যবদ্ধ নির্বাচন করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করার জায়গা থেকে আমরা এখানে।
প্রশ্ন: আপনারা যদি ক্ষমতায় গেলে কে প্রধানমন্ত্রী হবে ঠিক করেছেন?
উত্তর: কথা বলছি, একটু বলছি। তো প্রথম কথা তো হলো এই যে, জামাত দিতে চাচ্ছে অন্যারা নিতে দিতে চাচ্ছে না, বিষয়টা এরকম না। নেগোসিয়েশন হচ্ছে। যে আমরা জামাতকে কতগুলো আসনে ছাড় দিব, জামাত আমাকে কতগুলো আসনে ছাড় দিবে। হয়তো জামাত আমার রাজনৈতিক দলের চেয়ে বড় দল হিসেবে আমি তাকে বেশি আসনে ছাড় দিব, সে আমাকে কম আসনে ছাড় দিবে, বিষয়টা এরকম। তো এখানে স্বাভাবিকভাবেই এখনো পর্যন্ত নেগোসিয়েশনটা পূর্ণ হয়নি। অনেক দূর অগ্রসর হয়েছে। আবার কিছু কিছু জায়গা অমীমাংসিত আছে। তো আমরা এমনও করতে পারি যে, আমাদের যেই মতৈক্যের জায়গাগুলো পর্যন্ত আমরা হয়তো সমঝোতায় যাব। আর যেখানে আমরা চূড়ান্তভাবেই মতৈক্যে পৌঁছতে পারবো না, সেখানে আসনগুলো ওপেন থাকবে।
প্রশ্ন: মানে আপনাদের প্রার্থীরাও থাকবে?
উত্তর: আমাদের প্রার্থীরাও থাকবে, যারা যারা প্রার্থী রাখতে চাইবে, তাদের প্রার্থী থাকবে।
প্রশ্ন: তাহলে জোটের উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে না?
উত্তর: হ্যাঁ, কিছুটা তো কিছু ব্যাহত হবে, কিছু অর্জিত হবে। মানে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হওয়ার চেয়ে ৮০% বা ৯০% যদি অর্জিত হয়, আমি বলবো যে মোর দ্যান ৫০% যদি উদ্দেশ্য অর্জন হয়, তাহলে জোটের উদ্দেশ্যে বা অ্যালায়েন্সের উদ্দেশ্য সাকসেসফুল হয়। সেটা আমি মনে করি আর কি। তো কাজেই এখনো পর্যন্ত সেই কথা বলা বলার অবশ্য সময় আসেনি। আমরা হয়তো আজকে কালকের মধ্যেই একটা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে যাব। এবং আমরা আশা করছি যে, সকলেই ছাড় দিয়ে আমাদের যে বৃহত্তর উদ্দেশ্য, যে একটা ওয়ান বক্স পলিসি নিয়ে আমরা যেটা একটা অ্যারেঞ্জ করার উদ্দেশ্যে আমরা অগ্রসর হয়েছি, সেটা শেষ পর্যন্ত সফল হবে এই প্রত্যাশা আমি করছি এখনো।
প্রশ্ন: আপনাদের মানে জোট যদি ক্ষমতায় যায় প্রধানমন্ত্রী কে হবে? ওইটা কি ঠিক করেছেন?
উত্তর: না। এটা চূড়ান্ত করা হয়নি। জোট যদি ক্ষমতায় যায়, তাহলে যারা নির্বাচিত হবে, তারাই নির্ধারণ করবে তাদের নেতা কে হবে।
প্রশ্ন: আচ্ছা, নিজেদের মধ্যে ভোটাভুটি করে?
উত্তর: অবশ্যই যে কোন একটা প্রক্রিয়া অবলম্বন করা হবে।
প্রশ্ন: তো সেই ক্ষেত্রে তো তাইলে জামাতের আমিরেরই হওয়ার সম্ভাবনা বেশি, যেহেতু উনাদের প্রার্থী বেশি।
উত্তর: নাও হতে পারে। কারণ সবাই তো ইনসাফের ভিত্তিতে সেখানে ই করবে, আমি আশা করি। কাজেই সে ক্ষেত্রে অন্য কারো কারো দ্বারা যদি উদ্দেশ্য আরো ভালোভাবে অর্জিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, অন্য কেউ হতে পারে।
প্রশ্ন: পরিষ্কার।
উত্তর: জামাতের আমিরও হতে পারেন।
প্রশ্ন: অনুষ্ঠান শুরুর আগে আমি বলছিলাম যে, আপনার বাবার সাথে আমার দেখা হয়েছিল। এবং মোহাম্মদপুরের জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসায় উনি আমাকে একটি বই উপহার দিয়েছিলেন। আপনার বাবার প্রতি শ্রদ্ধা জানবেন আমার পক্ষ থেকে। তো মাদ্রাসার কথাটা এই কারণে আনলাম, সেই মাদ্রাসাতেই গেল ২৫ ডিসেম্বর আপনার সাথে তালেবানের শীর্ষস্থানীয় নেতা মোল্লা নূর আহমদ বুলবুল, যাকে মোল্লা জাওয়ানদী নামেও যিনি পরিচিত, তার একটি সাক্ষাৎ হয়েছিল। তার আগে আবার আপনারাও সেপ্টেম্বর মাসে গিয়েছিলেন। তো সেই সাক্ষাতে তার সাথে আপনাদের কী আলোচনা হয়েছে? এবং সেই সাক্ষাতের বিষয়টি মানে তিনি যে দেশে আসলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, গোয়েন্দা দপ্তরগুলো কেউ কিছু জানতো না। এখন উনি কি আসার আগে আপনাদেরকে জানিয়ে এসেছিলেন নাকি হঠাৎ করে এসে বললেন যে, মামুনুল সাহেব আসেন একটু চা খাই? বিষয়টি কী ছিল?
উত্তর: দেখেন একজন বিদেশ থেকে একজন মেহমান এসেছেন, অবশ্যই তিনি ভিসা নিয়েই তো এসেছেন। আমার ধারণা এটা। বাংলাদেশ তো এমন কোন রাষ্ট্র না যে, যে কেউ চাইলেই এখানে চলে আসবে। কাজেই তিনি বাংলাদেশের কোন হাই কমিশন থেকে, বাংলাদেশের কোন দূতাবাসের মাধ্যমে, রাষ্ট্র থেকে পারমিশন নিয়ে, ভিসা নিয়েই এসেছেন, এটাই আমরা মনে করি। কাজেই কিভাবে আসলেন সেই প্রশ্নের উত্তর তো আমি দিব না। সেই প্রশ্নের উত্তর দিবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অথবা বাংলাদেশের যারা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অথবা যারা বিমানবন্দরে ইয়ের কাজ করেন।
প্রশ্ন: কাস্টমসে রয়েছে।
উত্তর: ইমিগ্রেশনে যারা আছেন তারা জবাব দিবেন। তো বাংলাদেশের সাথে তাদের যে সম্পর্ক, যেহেতু বাংলাদেশে আফগানিস্তানের এখানে তাদের অফিসও আছে এবং তাদের প্রতিনিধি বাংলাদেশে থাকছেন। কাজেই মনে করে মিনিমাম একটা সম্পর্ক তো আছে। তিনি বাংলাদেশে এসেছেন এটা আসার আগেও আমরা জানতাম না। এসে তারপরে গণমাধ্যমেই আমি জেনেছি যে, বাংলাদেশে একজন আফগানিস্তানের প্রতিনিধি এখানে আসছেন। তারপরে হঠাৎ একদিন তিনি জামিয়া রাহমানিয়া আসলেন। তিনি বললেন যে, বিভিন্ন মাদ্রাসা ভিজিট করছেন তিনি, সেই সূত্রে আমাদের মাদ্রাসায় এসেছেন। এবং সেখানে আমার সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ কুশল বিনিময় হয়েছে। এর আগে ব্যক্তিগতভাবে উনার সাথে আমার দেখাও হয়নি। তো সেই হিসেবে জাস্ট কুশল বিনিময় এবং তার আসার উদ্দেশ্য জানতে চাইলাম। বলল যে, বাংলাদেশের সাথে একটা কূটনৈতিক এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার জন্যই তিনি বাংলাদেশ সফর করছেন। এতটুক পর্যন্তই তার সাথে আমার কথা হয়েছে।
প্রশ্ন: কোন নীতি নির্ধারণী বিষয়ে কি কথা হয়েছে? কারণ তিনি তালেবান সরকারের এশিয়া বিষয়ক নীতি নির্ধারণের মানে শীর্ষ নেতা বা গুরুত্বপূর্ণ একজন নেতা।
উত্তর: না তিনি নীতি নির্ধারণী বলতে এই জায়গাটাই যে, তিনি বাংলাদেশে তালাশ করছেন যে, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সাথে আফগান ইমারতে ইসলামিয়ার যে কূটনৈতিক সম্পর্কটা কিভাবে উন্নতি করা যায়। এবং বাংলাদেশের সাথে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের জায়গাটা কিভাবে উন্নয়ন করা যায়।
প্রশ্ন: তো সেটা তো তারা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাথে বৈঠক করলেই পারে।
উত্তর: বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে তারা বৈঠক করেছে, যতটুকু শুনেছি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাথে তারা চেষ্টা করেছে। হয়তো সেইভাবে ঠিক প্রক্রিয়া অবলম্বন তারা করতে পারে নাই। সেটা তাদের বিষয়। আমার কাছে শুধু বলেছে উদ্দেশ্য। আর আমি তো আর এর বাইরে কিছু বলতে পারি না।
প্রশ্ন: আচ্ছা। তিনি যখন বাংলাদেশ সফরে ছিলেন, তখন তাকে ঘিরে নিষিদ্ধ ঘোষিত হরকাতুল জিহাদের কয়েকজন ব্যক্তিকেও দেখা গেছে। এটা আমি পত্র-পত্রিকায় জেনেছি। এই বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখেন?
উত্তর: এটা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব। যেখানে নিষিদ্ধ কেউ আছে কিনা, থাকলে তার কি অবস্থা। তো এই বিষয়ে আমার অতিরিক্ত কোন কিছু জানা নেই।
প্রশ্ন: আচ্ছা। এই যে ধরেন আপনারা গেল বছরের সেপ্টেম্বরে গেলেন, তারা আসলো, এই সম্পর্কটা কি একদিনের নাকি অনেক আগের থেকেই ছিল? নাকি ৫ই আগস্টের পরে তৈরি হয়েছে? কিংবা কোন এক বিশেষ প্রেক্ষাপটে আপনাদের সাথে তালেবান সরকারের সম্পর্ক ভালো হচ্ছে?
উত্তর: দেখেন আমরা তালেবান সরকার বলি না। তারাও বলে না। তারা রাষ্ট্রের নাম দিয়েছে ইমারতে ইসলামিয়া অফ আফগানিস্তান। কাজেই সেই নামেই তাদেরকে আখ্যায়িত করা দরকার। তালেবান হলো ছাত্র। ছাত্রদের বিপ্লব হিসেবে তাদেরকে ছাত্র বলা হতো। এখন বাংলাদেশকে তো আপনি চব্বিশের বিপ্লবের পরে বাংলাদেশকে আপনি বলতে পারেন না যে, ছাত্র নাগরিক বাংলাদেশ। এরকম কোন নামে আখ্যায়িত করাটা, এটা একটা জাতি এবং একটা মানে স্বাধীন একটা রাষ্ট্রকে অসম্মান করার নামান্তর, যেটা বড়বড়ই আমরা করে থাকি বা অনেকে করে থাকেন। ইমারতে ইসলামিয়ার পক্ষ থেকে ইমারতে ইসলামিয়া প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর আমরা দেখছি যে, সারা পৃথিবী তাদের ব্যাপারে যেভাবে ব্যাপক কৌতূহলী। এবং আমাদেরও স্বাভাবিকভাবেই কৌতূহল আছে যে, তারা আসলে।
প্রশ্ন: ভারত তো রীতিমতন সম্মান দিয়ে নিয়ে গেছে।
উত্তর: হ্যাঁ, তারা কি করছে? তো সেই কৌতূহলের জায়গা থেকে সেখানে আমরা যেহেতু যাওয়ার একটা ইনভাইট পেয়েছি, তো সেখানে আমরা গিয়েছি। গিয়ে তাদের কাজগুলো দেখেছি যে, তারা কিভাবে কি করতেছে।
প্রশ্ন: মানে আপনাদেরকেই কেন ইনভাইট করল?
উত্তর: আমাদেরকে কেন? তারা তারা সারা দুনিয়া থেকেই বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি, বিভিন্ন ডেলিগেটকে তারা ইনভাইট করে।
প্রশ্ন: বাংলাদেশের কোন ডেলিগেট তো যায়নি?
উত্তর: আমি বলি। তো তারা মূলত যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটা বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত লোকজনদের একটা সংস্থা, প্রসপার আফগানিস্তান। তারাই মূলত এই অ্যারেঞ্জটা করেছে। তো তারা ইতিপূর্বে যুক্তরাজ্য থেকে বিভিন্ন ডেলিগেট নিয়ে তারা সেখানে গিয়েছে। তো তারা যুক্তরাজ্য থেকে যায়। তারা চিন্তা করল যেহেতু তারা বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত, দেশের প্রতি যে, আমার দেশের কিছু ইসলামিক স্কলারকে নিয়ে যদি আমরা সেখানে যেতে পারি, তাহলে ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে এবং বাংলাদেশের পার্সপেক্টিভ থেকে তারা বিচার করতে পারবে, মূল্যায়ন করতে পারবে। সেই হিসেবে আমাদের কাছে এটার অফার আসছে। তো আমরা মনে করেছি যে, আমাদের কৌতূহল আছে এবং একটা অভিজ্ঞতা নেওয়ার সুযোগ আছে, আমি কেন নিব না?
প্রশ্ন: পরিষ্কার।
উত্তর: তো সেই জায়গা থেকে আমরা গিয়েছি, দেখেছি তারা কাজ করতেছে। অনেক ভালো কাজ করতেছে, দুয়েকটা সমালোচনার জায়গা আছে, সেগুলো আমরা বলেছি।
প্রশ্ন: তো ধরে নিচ্ছি ইমারতে ইসলামিয়ার সাথে আপনাদের সম্পর্ক ভালো। আবার ভারতের সাথেও আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে ভালো।
উত্তর: ইমারতে ইসলামিয়ার সাথে সম্পর্কের এখন জায়গাটা বিশ্বের যে রাজনীতি এবং বিশ্ব যে কূটনীতি, তার গুরুত্বপূর্ণ একটা পয়েন্টে। ইমারতে ইসলামিয়ার সাথে এখন খুব ভালো সম্পর্ক, সবচেয়ে ভালো সম্পর্ক রাশিয়া এবং চায়নার। তারপরেই হলো ভারতের। তো কাজেই আমি মনে করি যে, বাংলাদেশের বা বাংলাদেশীর কোন ব্যক্তির বা কোন গোষ্ঠীর সম্পর্কের আগে, ইমারতে ইসলামিয়ার সাথে রাশিয়ার সম্পর্ককে নিয়ে আগে বিশ্লেষণ করা উচিত। তারপরে চায়নার সম্পর্ক নিয়ে বিশ্লেষণ করা উচিত। তারপরে ভারতের সম্পর্ক নিয়ে বিশ্লেষণ করা উচিত। তারপরে বাংলাদেশে আসার সুযোগ আছে, এর আগ পর্যন্ত না।
প্রশ্ন: ভারতের সাথে ইমারতে ইসলামিয়া সম্পর্ক ভালো হবে এটা ধরেন আমি কল্পনাই করিনি কখনো, বাট হচ্ছে মানে উনারা যেভাবে করে ট্রিট করল তাদের পরাষ্ট্রমন্ত্রীকে। আপনার কি মনে হয় যে, এইটা কোন একটা জিওপলিটিক্যাল গেইমের অংশ?
উত্তর: এটা জিওপলিটিক্যাল গেইমের কিছুটা অংশ, আর কিছুটা হলো দ্বিপাক্ষিক স্বার্থের বিষয়।
প্রশ্ন: আচ্ছা।
উত্তর: এখানে ইমারতে ইসলামিয়া বা আফগানিস্তান বিপুল সম্ভাবনাময় একটা ভূখণ্ড।
প্রশ্ন: খনিজ সম্পদ প্রচুর।
উত্তর: প্রায় বিশুল বিপুল পরিমাণ সাড়ে ছয় লক্ষ বর্গ কিলোমিটারের মানে এরিয়া, বিশাল এরিয়া। এবং একেবারে সম্পূর্ণ একটা নতুন মানে এটা। ও এমন একটা রাষ্ট্র যেটার উত্থান ঘটছে। তো সেখানে চায়না সবচেয়ে বেশি ইনভল্ভ হয়ে ব্যাপক ভাবে সেখান থেকে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছে। বিগত সরকারের আমলে এই বিগত যেই আমল ছিল এই সরকার আসার আগে।
প্রশ্ন: আওয়ামী লীগ সরকারের কথা বলছেন?
উত্তর: না না, আচ্ছা।
প্রশ্ন: আফগানিস্তানের, আচ্ছা।
উত্তর: আফগানিস্তানে বর্তমান ইমারত সরকার আসার আগে যে সরকারগুলো ছিল, তাদের সাথে ভারতের ব্যাপক ইনভেস্টমেন্টের সম্পর্ক ছিল। ভারতের আফগানিস্তানে বিপুল পরিমাণ ইনভেস্ট আছে। তো এখন বর্তমান সরকারের সাথে যদি ভারত সম্পর্ক ভালো না রাখে, তাহলে তারা দুই দিক থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাদের সেই ইনভেস্টমেন্টগুলো, তাদের যেই বিনিয়োগগুলো সেগুলোও তারা ঝুঁকির মুখে পড়বে। আর দ্বিতীয় হলো এখন যে নতুন তারা যে বড় বড় মানে সেখানে কার্যক্রম এবং পদক্ষেপগুলো নিচ্ছে, সেগুলো একচেটিয়া চায়না সেখান থেকে লাভবান হচ্ছে। তো সেই ক্ষেত্রে ভারত কেন তার প্রতিদ্বন্দ্বী চায়নাকে একচেটিয়া মার্কেটটা ছেড়ে দিবে।
প্রশ্ন: বাংলাদেশের সাথে তাহলে সম্পর্ক ভালো করছে না কেন?
উত্তর: বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক ভালো হচ্ছে না বাংলাদেশের দুর্বল পররাষ্ট্র নীতির কারণে। এখানে বাংলাদেশের জন্য বিশাল।
প্রশ্ন: এখন তো আওয়ামী পররাষ্ট্র নীতি।
উত্তর: আমি বলি, আমি বলি যে, বাংলাদেশের বিশাল সেখানে অপরচুনিটি আছে। যেরকম তাদের বড় একটা মার্কেট আছে সেখানে এই গার্মেন্টস এর, গার্মেন্টস সেক্টরের। বড় একটা মার্কেট আছে সেখানে ঔষধ রপ্তানির। বাংলাদেশে আমরা জানি ঔষধ শিল্প বিপুল সম্ভাবনাময়। এবং সেখানে মানে আফগান তারা আমাদেরকে খেদ প্রকাশ করলো যে, তাদেরকে এখন শুধু পাকিস্তান থেকে ঔষধ নিতে হয়। যার কারণে তারা কোনভাবেই শুধু একটা দেশের সাথে তারা ই থাকতে চায় না, বন্দিনী থাকতে চায় না। তো তারা বাংলাদেশকে সেই অফারগুলো করছে। বাংলাদেশের শিল্পোদ্যোক্তারা সেখানে যদি কোন ধরনের শিল্প প্রতিষ্ঠা করে, তাহলে সেখান থেকে খুব অল্প মূল্যে তারা সেখান থেকে শ্রম পাবে, যার মাধ্যমে সেখান থেকে তারা লাভবান হওয়ার সুযোগ আছে, যেই সুযোগগুলো নেওয়ার জন্য ভারত এবং চায়না সেখানে ব্যাপকভাবে প্রতিযোগিতা করছে। ইমারতে ইসলামিয়া এ্যাজ এ মুসলিম নেশন, তারা কিন্তু বাংলাদেশের প্রতি বিপুল উদ্দীপনা রাখে, আগ্রহ রাখে। যেহেতু আবার পাকিস্তানের সাথে তাদের বর্ডারকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু ঝামেলা আছে, এই জন্য তারা এই সাবকন্টিনেন্টালে একমাত্র মুসলিম দেশ, মুসলিম জাতি বাংলাদেশের প্রতি তাদের বিপুল আগ্রহ। বাংলাদেশ যদি এই সুযোগটাকে কাজে লাগাতে পারে, তাহলে বাংলাদেশের জন্যই এটা।
প্রশ্ন: এবং আপনি বলছেন এটা শুধুই ব্যবসা বাণিজ্যের জন্য অন্য কোন উদ্দেশ্যে?
উত্তর: না, অন্য কোন উদ্দেশ্যে না।
প্রশ্ন: আচ্ছা, পরিষ্কার।
উত্তর: এক্ষেত্রে আমি বাংলাদেশের দুর্বল পররাষ্ট্র নীতি এইজন্য বললাম যে, বাংলাদেশ ভয় পায়। বাংলাদেশ স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে মানে চায় না, পারে না। যেটা ভারত পারছে, যেটা চায়না পারছে।
প্রশ্ন: ওটা হচ্ছে বড় দেশ, ওই জন্য বোধহয়।
উত্তর: আচ্ছা আর কি।
প্রশ্ন: আচ্ছা আর কী। আমি একটু আবার বর্তমান রাজনীতিতে চলে আসতে চাইলাম। আপনাদের জোটসঙ্গী জামাত ইসলামের চাপাই নবাবগঞ্জ তিন আসনের যিনি একজন সাবেক সংসদ সদস্য এবং কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য লতিফুর রহমান, তিনি পহেলা জানুয়ারি একটি অনুষ্ঠানে ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, আওয়ামী লীগ থেকে জামাতে যোগ দিলে তারা সব দায়-দায়িত্ব নিবেন। এবং তাকে কোট আনকোট করে বলি, তিনি বলছেন, “আমাদের দলে আপনারা আওয়ামী লীগ থেকে আসবেন, আপনাদের সব দায়-দায়িত্ব আমরা নেব। জেলখানা যে কোন দায়-দায়িত্ব আমরা নেব ইনশাআল্লাহ।” এবং এর আগে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে আমরা দেখেছিলাম আওয়ামী লীগ নেতাকে নেতাকে ছাড়াতে থানায় গিয়েছিলেন জামাতের নেতা। এবং গাজীপুর আওয়ামী লীগ নেতাকে ছাড়াতে থানায় বিক্ষোভও করেছেন জামাতের নেতাকর্মীরা। আপনারাও কি আপনাদের জোটসঙ্গীদের মতন আওয়ামী লীগের ভোট টানার চেষ্টা করছেন কিংবা করবেন কিনা?
উত্তর: এখানে স্বাভাবিকভাবেই ভোটের রাজনীতিতে সকল ভোটারদেরই প্রত্যেকেই নিজের প্রতি আকৃষ্ট করার চেষ্টা করবে। এটাই গণতান্ত্রিক রাজনীতির বা নির্বাচনী লড়াইয়ের অন্যতম একটা বৈশিষ্ট্য। তো সেই ক্ষেত্রে অবশ্যই নীতি-নৈতিকতা এবং আদর্শিক যেই জায়গাটা, সেটাকে কোনভাবেই ইগনোর করার বা সেটাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার কোন সুযোগ নেই। তো আমি আমার নীতির উপর থেকে, আমি আমার আইডিওলজির উপর থেকে আমরা মনে করি যে, আওয়ামী আমলে যারা জুলুম-নির্যাতনের সাথে সম্পৃক্ত ছিল, গণহত্যার সাথে সম্পৃক্ত ছিল, একেবারে তৃণমূলের নেতৃত্ব পর্যন্ত, তারা সবাই তো এখানে অপরাধী। কিন্তু যারা ভোটার, তারা তো অপরাধী না। কাজেই তারা রাষ্ট্র চিন্তার, আগামীর উন্নয়নের জন্য, দেশের ভালোর জন্য, তারা যেন ভালো কোন চিন্তা করে, ভালো সিদ্ধান্ত নেয়, সেইজন্য অবশ্যই তাদেরকে আমরা নিজেদের দিকেও আকৃষ্ট করার চেষ্টা করব, এটাই স্বাভাবিক।
প্রশ্ন: আচ্ছা, পরিষ্কার। জামাতের অনেক প্রার্থীকেই বলতে শোনা গেছে যে, দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিলে বেহেশত পাওয়া যাবে। জানিয়ে রাজনীতিতে তর্ক-বিতর্ক কম হয়নি। সর্বশেষ আমি দেখলাম জামাতের একজন প্রার্থী তিনি বলছেন, কোট আনকোট করে আবারও বলি, “বিড়ি তে সুখ টান দিয়েও কেউ যদি দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের দাওয়াত দেয়, তবে আল্লাহ তাকে মাফ করে দিয়ে ভালো মানুষও বানিয়ে দিতে পারেন।” এমন মন্তব্যকে আপনি কিভাবে দেখেন এবং দাঁড়িপাল্লার পক্ষ থেকে যে বারবার এমন লোভনীয় অফার দেওয়া হয় জান্নাতে যাওয়ার, সেটা কি জোটসঙ্গী হিসেবে রিক্সায় ভোট দিলেও পাওয়া যাবে নাকি? বা আপনাদের অন্যান্য যারা শরীক আছে।
উত্তর: এখানে মূল আসলে যেই কনসেপচুয়াল যে জায়গাটা, সেটা পরিষ্কার থাকা দরকার। এরপরে কেউ বলতে ভুল করে, কারো উপস্থাপনা আপত্তিকর হতে পারে, মূল কথাটা হলো যে ভোট, এটা একটা পবিত্র দায়িত্ব। ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে ভোটের সাথে অনেকগুলো বড় বড় মানে বিধানের সম্পর্ক আছে। যেমন ভোট মানে হলো একজন মানুষকে নিজের প্রতিনিধি নিয়োগ করা। আমি যাকে ভোট দিচ্ছি, তাকে আমি আমার প্রতিনিধি নিয়োগ করছি। তাকে আমি দায়িত্বশীল নিয়োগ করছি। তো আপনি কি মনে করেন যে, মানুষ একটা মানুষকে দায়িত্বশীল নিয়োগ করাটা সাধারণ কোন বিষয় না তো? মামুলি বিষয় না। আমি যদি একটা ভালো মানুষকে প্রতিনিধি নিয়োগ করতে পারি, স্বাভাবিকভাবেই ইসলামের মূল মূল যে দৃষ্টিভঙ্গি কোরআন হাদিসের, যে যার প্রতিনিধি ভালো হবে, সেই প্রতিনিধি হিসেবে সে যত কার্যকর করবে, তার বেনিফিশিয়ারিও সে হবে এবং সে যত মন্দ কাজ করবে, তার দায় তার উপরে আসবে। কাজেই ভোটের এই জায়গাটা থেকে প্রত্যেক ভোটারকে এটা চিন্তা করতে হবে, আমি যাকে ভোট দিব, আমার ভোটের মাধ্যমে পাঁচ বছর সে যত অপকর্ম করবে, তার দায় আমার উপরে আসবে। সে যত সৎকর্ম করবে, তার জন্য আমি আল্লাহর নিকট এবং দুনিয়াতেও আমি তার জন্য আমি অবশ্যই আল্লাহর কাছ থেকে কোন বিনিময় পাব। এটাই হলো মূল কনসেপ্ট। কাজেই কেউ যদি মনে করে যে, যে কোন প্রার্থীকে ভোট দিলে সে ভালো কাজ করবে, সে সৎ কাজ করবে, তাহলে সে যদি এই উদ্দেশ্যে ভোটটা দেয়, তাহলে সে অবশ্যই এই ভালো প্রার্থীর যত ভালো কাজের সে একটা সে তার বিনিময় পাবে।
প্রশ্ন: তার মানে জামাতের প্রার্থীদের এমন আহ্বানে আপনার সমস্যা নেই?
উত্তর: না না। কিন্তু কথা হলো যে, সে আহ্বান, সেই বক্তব্যের মধ্যে মাত্রা নির্ধারিত করতে হবে এবং সীমার বাইরে যাওয়া যাবে না। যেমন কেউ যদি এরকম বলে, সুনির্দিষ্ট কোন প্রতীকে ভোট দিলে জান্নাতে চলে যাবে। এই ধরনের কথা তো গ্রহণযোগ্য না। হ্যাঁ এটা বলতে পারে যে, সৎ প্রার্থীকে ভোট দিলে তাহলে সেই ক্ষেত্রে সৎ প্রার্থীর যত ভালো কাজ করবে, সেই ভালো কাজের সে বিনিময় সে আল্লাহর কাছ থেকে পাবে। এতটুকু পর্যন্ত বলা যায়। কিন্তু এইভাবে কাউকে জান্নাতের কনফার্মেশন দেওয়ার সুযোগ কোন প্রার্থীর জন্য বা কোন প্রতীকের জন্যই এটা আমি মনে করি সমীচীন না।
প্রশ্ন: আমরা একটু শাপলা চত্বরের ঘটনাটায় চলে যেতে চাই। এবং আমি দেখছিলাম যে, সেটা নিয়ে তো আপনি অনেকবার কথা বলেছেন। এবং আমি সর্বশেষ দেখছিলাম যে, ১০ ডিসেম্বর ২০২২ এ ময়মনসিংহের একটি অনুষ্ঠানে আপনি বলছেন যে, ইসলামিক জনতাকে বারবার বুলেটের আঘাতে হত্যা করা হয়েছে। এবং কোট আনকোট করে বলি, “২০১৩ সালে শাপলা চত্বরে নির্বিচার পাখির মতন গুলি করা হয়, ২০২১ সালে মোদি বিরোধী আন্দোলনের কারণে আলেমদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।” তো শাপলা চত্বরের যে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা আপনারা বলছেন, সেখানে কতজন মারা গিয়েছিল তার কি কখনো কোন হিসাব আপনারা করেছেন?
উত্তর: হ্যাঁ। হিসাবের মধ্যে দুইটা কথা। শাপলা চত্বর এবং মূলত শাপলা চত্বর বলতে ৫ এবং ৬ই মে। শাপলা চত্বর থেকে শুরু করে একেবারে পরের দিন সন্ধ্যা পর্যন্ত, ৬ই মে সন্ধ্যা পর্যন্ত আপনার একেবারে।
প্রশ্ন: মানে শুধু মতিঝিল কেন্দ্রিক আপনারা ধরছেন না?
উত্তর: না না, মতিঝিল থেকে আপনি ধরে নেন চিটাগং রোড পর্যন্ত, অথবা কাঁচপুর পর্যন্ত। এই পরের দিনের সকাল থেকে সারাদিনের যে হত্যাকাণ্ড।
প্রশ্ন: তার মানে ঢাকা কেন্দ্রিকই রাখছেন? হাটহাজারী ওদিকে রাখছেন?
উত্তর: ওদিকে যাচ্ছি না। তো সেই হত্যাকাণ্ডে মানুষ অনেক মানুষ শাহাদাত বরণ করেছেন। সেই শহীদদের প্রথম কথা হলো যে, সকলের পরিচয় শনাক্ত করার সকল পথগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অনেক মানুষের লাশ গুম হয়েছে।
প্রশ্ন: আর অনেক। তো আপনাদের তো ট্রেস করার সুযোগ থাকে যে, আমার কোন কোন ছাত্ররা নেই।
উত্তর: না। আপনি এটা ইন্টারেস্টিং তথ্য হলো যে, এই শাপলা চত্বরের ঘটনায় শাহাদাত বরণকারীর সংখ্যা মাদ্রাসা থেকে মাদ্রাসার বাইরে অনেক বেশি। এখানে সব ধরনের মানুষ তো শাপলা চত্বরে এসেছিল। এটা তো আপনাকে এই, এটা এই ডেটাটা অ্যানালাইসিস করতে হবে।
প্রশ্ন: হ্যাঁ, আমি একটু জানার জন্যই।
উত্তর: আমি বলি একটু। যে এখানে প্রত্যেকটা রাজনৈতিক দলের কর্মী ওখানে। বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামাতে ইসলাম, অন্যান্য রাজনৈতিক দলের কর্মীরা। ইভেন অনেক আওয়ামী পরিবারের সন্তানরাও শাপলা চত্বরের যেই দাবি ছিল, সেই দাবিকে তারা সম্মান জানিয়ে সেই দাবির সাথে সহমত পোষণ করে বহু মানুষ সেখানে। এটা আমি বলতে পারি যে, সর্বদলীয় এক মহাজাগরণ ছিল। এবং সেখানে সর্ব সব শ্রেণীর পেশার মানুষ, বুয়েটের ছাত্র থেকে নিয়ে শুরু করে ট্রাক ড্রাইভার পর্যন্ত। সব শ্রেণীর মানুষ সেখানে শাহাদাত বরণ করেছে। তো কাজেই তার মধ্যে একটা পোরশন হলো মাদ্রাসার। কাজেই এখানে শাহাদাত বরণকারী অনেকের পরিবার চায় নাই যে, তার শহীদ সং তার শাহাদাতের এই তথ্যটা মানুষের সামনে আসুক। কারণ যারাই শাপলা চত্বরের শহীদ যেই পরিবারের সদস্য, বিগত পূর্ণ ফ্যাসিবাদী আমলেই চরমভাবে তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং শাসক দল কর্তৃক তারা নির্যাতনের শিকার ছিল।
প্রশ্ন: এখন তো বলতে পারে?
উত্তর: এখন হয়তো অনেকে। আমি বলছি, আমি বলছি দুইটা তথ্য এখানে। এক নম্বর তো হলো যে, অনেক পরিবার এমনও আছে যারা নাকি আওয়ামী মানসিকতায়।
প্রশ্ন: তাদের কথা বাদ দিলাম, অন্য যারা আছে সাধারণ।
উত্তর: হ্যাঁ এরকম কিছু অংশ থাকবে। কিছু অংশ আছে হয়তো তাদের ইনফরমেশন তারা দিয়েছে থানায়, সেগুলো কালেকট করা সম্ভব হয় না। থানা যদি আমাদের কে না জানায়। দুই। তিন নম্বর হলো অনেক মানুষ এমনও মানুষ আছে যে, সে আসলে নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে। কবে হইছে? ঢাকায় থাকতো, ফ্যামিলি জানে না ঢাকায় সে শাপলা চত্বরের আগে পরে কখন কোথায় গিয়েছে। কাজেই এক নম্বর কথা আমাদের ধারণা যে, বেশ কিছু ইনফরমেশন এটা উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
প্রশ্ন: তারপরও একটা রাফলি এস্টিমেট তো হতে পারে।
উত্তর: হ্যাঁ, রাফলি। আমরা পরবর্তীতে একেবারে অথেন্টিক সোর্স থেকে যেই সকল তথ্যগুলো যাচাই করেছি, তাতে আমাদের কাছে ৫৮ জন শাপলা চত্বরের শহীদের তথ্য আমরা উদ্ঘাটন করেছি এবং তাদের সবিস্তারে তাদের কবর, তাদের জানাজার জায়গা, তাদের শাহাদাতের স্থান এই সব ইন ডিটেইলস আমরা সেটা শহীদনামা নামে, শাপলা স্মৃতি সংসদ নামের সংগঠনের পক্ষ থেকে আমরা স্মারক আকারে সেটা প্রকাশ করেছি। এবং সেটার উপরে ভিত্তি করেই কিন্তু এই যে কিছুদিন আগে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তাদের প্রত্যেক পরিবারকে দশ লক্ষ টাকা করে একটা অনুদান প্রদান করা হয়েছে।
প্রশ্ন: আচ্ছা। আমি একটু আবার ইসলামী রাজনীতিতে চলে আসতে চাই। ভারতীয় উপমহাদেশের একজন প্রখ্যাত আলেম ছিলেন মাওলানা মোহাম্মদ উল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর। এবং স্বাধীন বাংলাদেশে তিনিই প্রথম ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন যিনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে নির্বাচন করেছিলেন বা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। তার মতন চরিত্রকে আপনার কাছে মনে হয় যে, উনি চলে যাবার পরে, ৮৭ তে চলে যাবার পরে আলেম সমাজ থেকে আর কেউ তার মতন রাজনৈতিক ক্যারেক্টার হয়ে উঠতে পেরেছে কিনা? এক। যদি না হয়ে থাকে, তার কারণটা কি? দুই। এবং তৃতীয়ত হচ্ছে যে, তার সময়ে যেমন আপনার বাবাও তো তার ছাত্র ছিলেন, সেই সময়ে ফজলুল হক আমিনী তার ছাত্র ছিলেন, সৈয়দ মোহাম্মদ ফজলুল করিম তিনি তার ছাত্র ছিলেন, যারা তিনজনই তিনটা আলাদা দল করলেন। ভাঙনটা কেন হলো?
উত্তর: এখানে হাফেজ্জী হুজুর রহমতুল্লাহি আলাইহির পরে আমি যেটা মনে করি যে, হাফেজ্জী হুজুর রহমতুল্লাহি আলাইহি ছিলেন এমন একটা বয়সে গিয়ে তিনি রাজনীতিতে পদার্পণ করেছেন, যখন তার সমকালীন আর তেমন কেউ পৃথিবীতে ছিলেনই না। যারা ছিলেন তারা সবাই তার শীর্ষ পর্যায়ের। কাজেই এই জন্য তার নেতৃত্বটাকে সকলে যেভাবে সহযোগিতা করেছেন, এটা একটা খুব সহজ বিষয় ছিল। এবং এটা বিগিনিং পয়েন্ট ছিল। বিগিনিং পয়েন্টে ঐকমতটা খুব সহজেই হয়ে যায়। এক। দ্বিতীয় কথা হলো হাফেজ্জী হুজুরের পথ ধরে বাংলাদেশে এই পর্যন্ত আরো তিনজন নেতৃত্ব, তিনটা নাম খুব সহজভাবেই বলা যায়। একজন শাইখুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক, দ্বিতীয় জন পীর সাহেব চরমোনাই মুফতি সৈয়দ ফজলুল করিম আর তৃতীয় জন হলেন মুফতি ফজলুল হক আমিনী। এই তিনটা নামও কিন্তু পর্যায়ক্রমিকভাবে হাফেজ্জী হুজুরের সেই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের রাজনীতিতে সমুজ্জ্বল এবং ভাস্বর। একই মর্যাদায়ই আমি মনে করি পর্যায়ক্রমিকভাবে। পরবর্তীতে সাময়িক কিছু সাংগঠনিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের মধ্যে দ্বিধা-বিভক্তি ছিল, কিন্তু বৃহত্তর রাজনৈতিক মঞ্চে তারা সবসময় ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা পালন করেছেন।
প্রশ্ন: কিন্তু ভোটের রাজনীতিতে তো ভোট ভাগাভাগি হয়ে গেল না?
উত্তর: ভোটের রাজনীতিতে ভোট ভাগাভাগি হয়েছে, কিন্তু অধিকাংশ সময় তারা ঐক্যবদ্ধভাবে ভোট করেছেন। ৯১ সালেও তারা ঐক্যবদ্ধভাবে ইলেকশন ফেস করছেন। ৯৬ সালে তারা ঐক্যবদ্ধভাবে ইলেকশন ফেস করেছেন। ২০০১ সালে এসে দ্বিধা-বিভক্তি সৃষ্টি হয়েছে চার দলীয় জোটকে কেন্দ্র করে। কাজেই তখন বৃহত্তর প্রয়োজনে ইসলামিক অঙ্গন যখন বাইরের অন্যদের সাথে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রশ্ন এসেছে, তখন একটা মানে ইভাবে দৃষ্টিভঙ্গিগত মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে। এছাড়া কিন্তু তারা ভোটের রাজনীতিতে বিরোধ করেননি।
প্রশ্ন: জামাতের সাথেও কখনো ইসলামী দলগুলোর ঐক্য হয়নি, ১৯৮৯ এর পরে এবার হলো। ভেবেছিলাম এটা নিয়ে প্রশ্ন করব। আপনাদের হেফাজত ইসলামের যিনি রয়েছেন আমির, তিনিও জামাতকে নিয়ে অনেক সময় অনেক কথা বলেন। যদিও আপনি বলেছেন এগুলো সবই ব্যক্তিগত সম্পর্ক। মানে ব্যক্তিগত মন্তব্য। আপনার কি মনে হয় যে, মানে জামাতের যেই আকিদা নিয়ে আপনাদের বেসিক প্রশ্নটা, অর্থাৎ মওদুদীবাদ এর সাথে দেওবন্দের যেই জায়গায় মূল তর্ক। তো ওই মওদুদীবাদ এর থেকে কি জামাত সরে আসছে বলে আপনার এখন বিশ্বাস করছেন?
উত্তর: না। আমরা রাজনীতিতে এই আকিদার সেই প্রশ্নটাকে আমরা বড় করে দেখছি না। আমি যেটা বলি যে, এই যে কথাটা যে, এবারই প্রথম জামাতের সাথে রাজনৈতিক ঐক্য, এটার সাথে আমি ডিফার করছি। ২০০১ সালে যে চার দলীয় জোট গঠিত হলো, সেই চার দলীয় জোটের অন্যতম দুই শরিক, একটা ছিল জামাতে ইসলাম, আরেকটা ছিল ইসলামী ঐক্যজোট। ইসলামী ঐক্যজোটের আন্ডারে বাংলাদেশের কওমী অঙ্গন সম্পূর্ণ ঐক্যমত্বভাবেই তারা কিন্তু একই সাথে জোটবদ্ধ হয়ে জামাতের সাথে কাজ করেছে। এক। দ্বিতীয় হলো শুধু বাংলাদেশ না, আমাদের সাবকন্টিনেন্টালে জামাতের সাথে দেওবন্দী ঘরানার রাজনৈতিক দল এবং ব্যক্তিত্বদের ঐক্যের ইতিহাসটা নতুন না। আমরা দীর্ঘ প্রায় দুই যুগ ধরে দেখছি পাকিস্তানের জমিয়তে ওলামায়ে ইসলামের যেই উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব যিনি মাওলানা ফজলুর রহমান সাহেব, তিনি কিন্তু দুই যুগ ধরে জামাতে ইসলামকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে সেখানে রাজনীতি করছেন। কাজেই আমরা সেই জায়গাটা বাংলাদেশে স্বাধীনতা, বাংলাদেশে যে আধিপত্যবাদ বিরোধী লড়াই সংগ্রাম, জুলাই বিপ্লব এই সবকিছুর বিবেচনায় আমরা মনে করছি যে, বাংলাদেশে বর্তমানে যে আমাদের যে বৃহত্তর রাজনৈতিক যে প্রশ্নগুলো, সেই প্রশ্নগুলোর সমাধানের জন্যই মূলত এই মুহূর্তে।
প্রশ্ন: কিন্তু আপনাদের আকিদার জায়গা তো পার্থক্য রয়ে যাচ্ছে।
উত্তর: পার্থক্য রয়েই আছে।
প্রশ্ন: আপনি একজন ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান। আপনার বাবা শাইখুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক। তার বাবাও ধনাঢ্য পরিবার ছিল, আপনাদের রমনায় একটা পেট্রোল পাম্প ছিল, সেই সময় বাড়ি ছিল। এবং আমি আপনার একটি বক্তব্যে শুনছিলাম যে, তখন বিলাতে ব্যারিস্টারি পড়তে খরচ হতো, মানে হাত খরচ দেওয়া হতো ৫০ টাকা, আপনার বাবাকে আপনার দাদা ১০০ টাকা করে দিতেন। তো কওমী মাদ্রাসার ক্ষেত্রে একটা ধারণা আছে যে, সেখানে যাদের কিছু নেই, গরীব, এতিম তারা পড়তে আসেন। এই ধারণাটা কিভাবে তৈরি হলো এবং ওই যে একটা ওয়েল বিল অফ মানে বিলং ফ্যামিলি, সেখান থেকে কওমী মাদ্রাসায় কেন অনেক বেশি মানুষ আসলেন না? এবং কওমী মাদ্রাসার থেকে যারা পাশ করে বের হচ্ছেন, তাদেরকে কি বাংলাদেশের মেইনস্ট্রিমের অংশ আপনি বলবেন কিনা?
উত্তর: প্রথম কথা ধনাঢ্য পরিবার বলা যাবে না ঠিক, সচ্ছল পরিবার। আলহামদুলিল্লাহ। দ্বিতীয় কথা হলো যে, কওমী মাদ্রাসায় দীর্ঘ একটা সময় হয়েছে কি, আসলে মূল সংগ্রামটা আমাদেরকে করতে হয়েছে শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে, দীর্ঘ ব্রিটিশ আমলটা জুড়েই। তো ব্রিটিশ আমলটা জুড়ে আমাদেরকে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে এবং তাদের আইডিওলজির বিরুদ্ধে, তাদের আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে মূল সংগ্রামটা দেওবন্দী আলেমরা করেছেন। যার কারণে ব্যাপকভাবে তাদের দ্বারা নিগ্রহণের শিকার। এবং মূলত ভারত উপমহাদেশে ব্রিটিশের যেই সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন তার সবচেয়ে বড় আগ্রাসনটা হয়েছে শিক্ষা ক্ষেত্রে। শিক্ষা ক্ষেত্রটা এর আগে কিন্তু সম্পূর্ণই আমি বলবো যে, কওমী ঐতিহ্যের যেই ধারাটা, ইসলামী শিক্ষার ধারাটা, বাংলাদেশের মেইনস্ট্রিমেই শিক্ষা ছিল, বাংলাদেশ বলতে এই ভারত উপমহাদেশে। এটাই ছিল মেইন মূল ধারার শিক্ষা। এই শিক্ষা ব্যবস্থাটাকে বাতিল করে, এটার বিরুদ্ধেই ব্রিটিশ সরকার ভিন্ন একটা নতুন শিক্ষা ব্যবস্থা তারা প্রবর্তন করে। যার কারণে লড়াইটা সেই জায়গায় এবং তারা যেই শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন করে, সেই শিক্ষার মাধ্যমে যারা শিক্ষা শিক্ষিত হয়ে আসছে, তাদেরকে রাষ্ট্রীয় সকল জায়গাগুলোতে তারা সেখানে সুযোগ দিয়েছে, কাজ করিয়েছে। যার কারণে কওমী বা ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিতরা মূল ধারা থেকে বা রাষ্ট্রের যে মূল ওযে, সেখান থেকে স্রোত থেকে তারা একটু আলাদা হয়ে গিয়েছে। তো আমি মনে করি যে, যখনই আসলে স্বাধীন রাষ্ট্র হয়েছে, তখনই এই বিষয়গুলোর সমন্বয় হওয়া প্রয়োজন ছিল। সেটা ১৯৪৭ সালেও প্রয়োজন ছিল। আবার যখন ১৯৭১ এ স্বাধীনতা লাভ করেছি, আমাদের এখানেও প্রয়োজন ছিল। কিন্তু স্বাধীনতা পরবর্তী সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানরা বা রাষ্ট্র সরকারগুলো, তারা এই ব্যাপারে চরম দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে। সেটার রেশ এখনো আমাদেরকে টানতে হচ্ছে।
প্রশ্ন: আপনারা কি আপনাদের কারিকুলাম আপডেট করেছেন?
উত্তর: হ্যাঁ। আমাদের কারিকুলাম আমরা দুই দুই কারণে পরিপূ্র্ণ আপডেট করতে পারি না। একটা হলো জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় যে ন্যূনতম ধর্মীয় শিক্ষার প্রয়োজন, যার যার মাধ্যমে সমাজে ইসলামের যে মৌলিক শিক্ষাটুকু থাকবে, সেটার কোন আয়োজন নেই। কোন আয়োজন না থাকার কারণে এখন সমাজে যেই একটা ইসলামিক স্কলার মিনিমাম যেই পরিমাণ দরকার, যেই সংখ্যাটা প্রয়োজন, সেই সংখ্যাটা সম্পূর্ণই কওমী মাদ্রাসাকে সাপ্লাই দিতে হচ্ছে। আদারস আদারওয়াইজ এই জাতির মধ্যে ইসলাম এবং ঈমান সংক্রান্ত মৌলিক শিক্ষাটুকুও থাকবে না। তো এই চাপটা সামাল দিতে গিয়েই আমাদেরকে অন্য দিকে মনোযোগ দিতে যথেষ্ট বিলম্ব হয়েছে। তো এখন আমরা আশা করছি যে, আমরা বিগত মনে করেন এক দশক ধরে বা দুই দশক ধরে যথেষ্ট এমন কাজ করা হচ্ছে মাদ্রাসাগুলোর আলেমদের তত্ত্বাবধানে, যার মাধ্যমে বিপুল একটা জনগোষ্ঠী তারা কিন্তু এখন জেনারেল সাধারণ শিক্ষার ধারার সাথে সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারতেছে।
প্রশ্ন: আচ্ছা। একটা তাত্ত্বিক প্রশ্ন করতে যাচ্ছিলাম। আল্লাহতালা তো কোরআন শরীফে বলেছেন যে, ‘ইন্না নাহনু নাজ্জালনাজ জিকরা ওয়া ইন্না লাহু লাহাফিজুন’। কোরআন শরীফের সংরক্ষণের দায়িত্ব তিনি নিজে নিয়েছেন। তো সেই কোরআন শরীফ, যেটা আল্লাহতালা মানে পৃথিবীর একমাত্র গ্রন্থ যা ১৪০০ বছর ধরে অবিকৃত রয়ে গেছে, সেই কোরআন শরীফ অবমাননার বহু সময় বহু অভিযোগ ওঠে। সে অভিযোগের ভিত্তিতে আমরা দেখলাম মানুষ পিটিয়ে মারার মতন ঘটনা হয়, পুড়িয়ে মারার মতন ঘটনা হয়। তাত্ত্বিক প্রশ্নটা এই জায়গায়, যেই কিতাব সংরক্ষণের দায়িত্ব আল্লাহতালা নিজে নিয়েছেন, সেই কিতাব কি সাধারণ মানুষের পক্ষে অবমাননা করা সম্ভব নাকি? এক। দ্বিতীয় হচ্ছে যে, তাকে ঘিরে যেই সহিংসতা, সেটা ইসলাম কোনভাবে সমর্থন করে কিনা?
উত্তর: প্রথম প্রশ্ন হলো যে, আল্লাহ হেফাজত করবেন, দায়িত্ব নিয়েছেন, কিন্তু দায়িত্বটা পালিত হবে কিভাবে? স্বাভাবিকভাবেই আল্লাহপাক যে দায়িত্বটা পালন করবেন, এটা দুইটা স্তরে আল্লাহ করবেন। এটা কোরআনের আয়াতের হাদিস এবং ইতিহাসের বিভিন্ন জায়গা থেকে আমরা। প্রথমত হলো এটার দায়িত্ব হলো, যারা ঈমানদার তাদেরই দায়িত্ব হলো প্রথমত যে, কোরআনের সম্মান রক্ষা করা এবং কোরআনকে হেফাজত করা। এইজন্যই সাহাবীদের যুগ থেকে আজ পর্যন্ত বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
প্রশ্ন: লিখিত করা হয়েছে।
উত্তর: হ্যাঁ লিখিত করা হয়েছে, মুখস্ত করানো হয়েছে। কেন? যেন কোরআনটা সংরক্ষিত থাকে। মানুষ উদ্যোগ নিবে, আল্লাহপাক সেটাকে সম্ভব করবেন এবং আল্লাহ সেটা তৌফিক দিবেন। পৃথিবীর অন্য কোন গ্রন্থকে এইভাবে মুখস্ত করা যায় না, যেভাবে কোরআনকে মুখস্ত করা যায়। কেন? এটা আল্লাহ তৌফিক দেন। আল্লাহ মানুষকে মানুষের বক্ষে কোরআনকে সংরক্ষণ করে দেন। কিন্তু এমনিতেই তো করেন না, আপনাকে তো কোরআন হিফজও করতে হবে, তারপর আল্লাহ সংরক্ষণ করবেন। আপনি যদি হিফজও না করেন, তো অটোমেটিকভাবে তো আপনার বক্ষে কোরআন সংরক্ষিত হবে না। এটা প্রথম কথা যে, আল্লাহ এভাবেই হেফাজতটা করবেন। মানুষ যদি সেখানে ব্যর্থতার পরিচয় দেয় ঈমানদাররা, তখন আল্লাহপাক তার বিশেষ যে শক্তি, সেটার আল্লাহ বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে আল্লাহপাক যে কোনভাবে সেটা কোরআনকে হেফাজত করবেন। এবং সেটারও ব্যবস্থাটা এই হবে যে, আল্লাহ তখন বিশ্বাসী জাতির মধ্যে পরিবর্তন আনবেন। যারা কোরআন রক্ষা, কোরআনের সম্মান রক্ষায় ব্যর্থ হবে, তাদেরকে আল্লাহ ধ্বংস করে দিয়ে আল্লাহ নতুন আরেকটা সম্প্রদায়কে ইসলামের দিকে নিয়ে আসবেন, যারা কোরআনের মর্যাদা রক্ষা করবে। এটাই হলো আল্লাহপাকের প্রত্যয় এবং আল্লাহর ঘোষণা। দ্বিতীয় বিষয় হলো যে, কোরআনের যে অবমাননা যদি কেউ করে। আপনি প্রশ্ন করেছেন যে, কোন মানুষের পক্ষে অবমাননা করা সম্ভব কিনা? অবশ্যই কোরআনের সাথে অসম্মানজনক আচরণ যেই করবে, সেটা অবমাননা ধরে ধরা হবে। এবং সেটা কোরআনের প্রতি অসম্মান এবং অবমাননা, এটা ভয়ঙ্কর অপরাধ এবং এটা চরম সর্বোচ্চ শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কোরআনকে যদি কেউ অসম্মান করে, এটা হলো কুফুর। শুধু কুফুর না, যেটাকে আমরা বলি ইরতেদাদ। ইসলামকে ত্যাগ, ইসলামকে চরমভাবে কটুক্তি করার শামিল। কাজেই তারও সর্বোচ্চ শাস্তি ইসলাম কর্তৃক মৃত্যুদণ্ড নির্ধারিত। তবে সেই শাস্তিটা প্রয়োগ করার দায়িত্ব হলো রাষ্ট্রের। তিন নম্বর জায়গাটা আমি বলি অবশ্যই যে, এইভাবে মব করে অথবা কোন ধরনের আইনি প্রক্রিয়া ব্যতিরেকে মানুষ সরাসরি কোন ব্যক্তির উপর এইভাবে গণহারে মানে তার উপর হামলে পড়বে, এটার কোন সুযোগ ইসলামের মধ্যে নেই। কাজেই কাউকে এরকমভাবে গণপিটুনি দিয়ে মেরে ফেলা আর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলার তো কোন অবস্থাতেই সুযোগ নেই। কোন ব্যক্তিকেই, কোন প্রাণীকেইও আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারা সরাসরি এটা হাদিসের মধ্যে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
প্রশ্ন: এটা আমরা সম্প্রতি এক হিন্দু ব্যক্তিকে পুড়িয়ে মারার ঘটনা।
উত্তর: আমি মনে করি যে, এই জাতীয় যে ঘটনাগুলো ঘটে, প্রত্যেকটা ঘটনা তদন্ত করলে যেটা দেখা যায় যে, এখানে আসলে অবমাননার চেয়েও ভিন্ন কোন বিষয় থাকে। হয়তো কেউ কোন কোন ব্যক্তির উপর কোন গোষ্ঠীর বা কোন ব্যক্তির আক্রোশ থাকে, সে এটাকে ট্যাগিং করে এইভাবে মানুষকে উস্কিয়ে দিয়ে একটা দুর্ঘটনা ঘটায়।
প্রশ্ন: ডেইলি স্টার এবং প্রথম আলোর হামলাকে আপনি কিভাবে দেখেছেন? সেখানে জামাত শিবিরের অনেকের নাম উঠে এসেছিল। এটা কি সুযোগ আছে? মানে আপনি ধরে নিলাম তারা ইসলাম বিরোধী কর্মকাণ্ড করে, কিন্তু আপনি কি সেখানে যে হামলা চালাতে পারেন?
উত্তর: না, আমি কোন একজন ব্যক্তির উপরেই যেহেতু বিচার বহির্ভূতভাবে এভাবে হামলা করার কোনভাবে বৈধতা দেখি না।
প্রশ্ন: ইসলামেও সুযোগ নেই?
উত্তর: কাজেই কোন একটা প্রতিষ্ঠানে এইভাবে হামলা করার এটা তো সঠিক কাজ না।
প্রশ্ন: সামনের নির্বাচন নিয়ে কি ভাবছেন? লেভেল প্লেইং ফিল্ড কিরকম আছে? আপনারা বারবার অভিযোগ করছিলেন কি?
উত্তর: নির্বাচন নিয়ে হ্যাঁ, এখনো আমাদের অভিযোগ আছে। আমাদের ধারণা যে, প্রশাসনের মধ্যে ব্যাপকভাবে এক দিকে ঝুঁকে পড়ার মনোবৃত্তি আছে।
প্রশ্ন: কিন্তু শোনা তো যায় প্রশাসনের বেশিরভাগ লোক আসলে জামাতপন্থী।
উত্তর: আমার কাছে সেরকম মনে হয় না। প্রশাসনের বেশিরভাগ লোক জামাতপন্থী হওয়ার সুযোগ নেই।
প্রশ্ন: মানে আমি প্রশাসনেরই বেশ কিছু লোকের সাথে কথাবার্তা বলে তারা গ্যারান্টি দিয়ে বলছে যে, রয়েছে।
উত্তর: এটা হতে পারে। আমার কাছে এরকম মনে হয় না। আমার কাছে মনে হয় প্রশাসনের বেশিরভাগ লোক, গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বা মানে একটা ভালো জায়গায় ব্যাপক হারে প্রশাসনের লোকজন তারা বিগত ১৫ বছরের আমলে যারা নিয়োগ পেয়েছেন, বিভিন্ন জায়গায় যাদের পোস্টিং হয়েছে, তাদের হয়তো গুরুত্বপূর্ণ পোস্টগুলো থেকে তাদেরকে অন্য জায়গায় সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তারা বিপুল একটা সংখ্যক আছে। এর আগে যারা।
প্রশ্ন: আর এক দিকে ঝুঁকে রয়েছে প্রশাসন। আপনার কি মনে হয়? মানে অভিযোগটা এক্স্যাক্টলি কাদের দিকে? কোন কোন নির্দিষ্ট দল?
উত্তর: আমি নির্দিষ্ট দলের নাম বলবো না। তবে মনে করি যে, অতীতে যারা রাষ্ট্র ক্ষমতা পরিচালনা করেছে, স্বাভাবিকভাবেই তাদের দ্বারা নিয়োগপ্রাপ্ত বহু জন সংখ্যা এখানে আছে প্রশাসনের মধ্যে। স্বাভাবিকভাবেই তাদের আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত লোকগুলো বিগত ১৫ বছরের আমলের লোকজন যেরকম তাদের নিয়োগদাতার প্রতি তারা আকৃষ্ট। স্বাভাবিকভাবেই পূর্ব ইতিপূর্বে যারা রাষ্ট্র ক্ষমতা পরিচালনা করেছে।
প্রশ্ন: আমার ধারণা দর্শকরা বুঝতে পেরেছে আপনি কাদের কথা বলছেন। আল্লামা মোহাম্মদ মামুনুল হক আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ আমাদের কে আজকে এতক্ষণ সময় দিলেন। আপনার তো সামনে নির্বাচনী ক্যাম্পেইন শুরু হবে সেজন্য আপনার প্রতি শুভকামনা থাকল। আশা করব নির্বাচনের আগে হয়তো আবারও যদি আপনার সাথে কথা বলার সুযোগ হয় আর অনুমতি দিলে আজকের অনুষ্ঠানটা এখানে শেষ করছি।
মামুনুল হক: ইনশাআল্লাহ। জাযাকাল্লাহ।
