স্টাফ রিপোর্টার ।।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির ও হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক জাতীয় এক দৈনিকের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে আগামী নির্বাচন, জোটের রাজনীতি, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সম্পর্ক, শাপলা চত্বর ও সোনারগাঁওয়ের ঘটনা, এবং বিএনপির রাজনৈতিক ভূমিকাসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকারটির চৌম্বক অংশ তুলে ধরা হলো।
নির্বাচনে অংশগ্রহণের সম্ভাবনা
মাওলানা মামুনুল হক জানান, তিনি ব্যক্তিগতভাবে নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী নন, তবে দলীয় ও জাতীয় প্রয়োজনে তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন। তিনি সম্ভাব্য তিনটি আসনের কথা উল্লেখ করেন: ঢাকা-১৩ (মোহাম্মদপুর), ঢাকা-৭ (লালবাগ), এবং বাগেরহাট-১ (চিতলমারী, মোল্লাহাট ও ফকিরহাট)। তিনি বলেন, মোহাম্মদপুর ও লালবাগে তাঁদের দীর্ঘদিনের কার্যক্রম এবং আলেম সমাজের ঐতিহ্যগত তৎপরতার কারণে একটি শক্তিশালী সমর্থন বেস রয়েছে। বাগেরহাটে তাঁর পারিবারিক যোগাযোগও তাঁর পক্ষে কাজ করবে। তিনি দাবি করেন, তাঁদের দলের একক শক্তি না থাকলেও ধর্মীয় ও সামাজিক ইস্যুতে গণসম্পৃক্ততার মাধ্যমে তারা নির্বাচনে ভালো ফলাফল করতে পারবে।
জোটের রাজনীতি ও বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক
মাওলানা মামুনুল হক বলেন, নির্বাচনে জোটবদ্ধভাবে অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তবে এককভাবেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে ভালো ফলের আশা করা যায়। তিনি জানান, বিএনপির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনা না হলেও, মোহাম্মদপুর আসনে তাঁকে ছাড় দেওয়ার বিষয়ে গুঞ্জন শুনেছেন। তিনি বিএনপির শীর্ষ নেতা তারেক রহমানের সঙ্গে প্রয়োজনে কথা হওয়ার কথা স্বীকার করেন, তবে সর্বশেষ কথোপকথন বেশ কিছুদিন আগে হয়েছে।
ইসলামি দলগুলোর মধ্যে নির্বাচনী সমঝোতার বিষয়ে তিনি বলেন, এ নিয়ে আলোচনা চলছে এবং সম্ভাবনা রয়েছে। তবে কিছু দল বিএনপির সঙ্গে জোটে বেশি আগ্রহী, আবার কেউ কেউ জামায়াতসহ ইসলামি ঘরানার দলগুলোর ঐক্যের পক্ষে। তিনি জানান, সংসদের উচ্চকক্ষে সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতি চালু হলে ছোট দলগুলো নিজেদের শক্তির ওপর ভর করে নির্বাচন করতে আগ্রহী হতে পারে, যা জোট গঠনে জটিলতা তৈরি করতে পারে।
জামায়াতের সঙ্গে মতপার্থক্য
জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে মাওলানা মামুনুল হক বলেন, তাঁদের দলের সঙ্গে জামায়াতের মূল পার্থক্য মাওলানা মওদুদির চিন্তাধারার। তিনি জানান, কওমি আলেমদের সঙ্গে মওদুদির চিন্তার মতপার্থক্য এখনো রয়ে গেছে। তবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিদেশি আধিপত্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জামায়াত ও দেওবন্দি ধারার দলগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক ঐক্যের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। তিনি মনে করেন, জামায়াতের ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়কার ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, আদর্শিক পার্থক্যই আলেম সমাজের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
শরিয়াহভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা
মাওলানা মামুনুল হক শরিয়াহভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পক্ষে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের সমর্থনে আইন ও সংবিধানের ইসলামাইজেশন সম্ভব। তিনি সংসদে নির্বাচিত হলে তাঁর প্রথম তিন অগ্রাধিকার হবে: কোরআন-সুন্নাহবিরোধী আইন বাতিল করা, সংখ্যালঘুদের ইসলামি অধিকার নিশ্চিত করা, এবং বিচারব্যবস্থায় কোরআনের দণ্ডবিধি কার্যকর করা।
শাপলা চত্বর ও সোনারগাঁওয়ের ঘটনা
২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের ঘটনাকে তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করেন, যাকে তিনি ‘নতুন বালাকোট’ বলে তুলনা করেন। তিনি এই ঘটনাকে তাঁর জীবনের স্মরণীয় ও পরিশীলিত করার একটি ভিত্তি হিসেবে দেখেন। অন্যদিকে, ২০২১ সালে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ের ঘটনাকে তিনি দুঃখজনক বলে উল্লেখ করেন, যেখানে তাঁকে চরিত্র হননের চেষ্টার সম্মুখীন হতে হয়েছে। তবে তিনি এই ঘটনা থেকে উপলব্ধি করেন যে শেখ হাসিনা ও ইসলামবিদ্বেষী বিদেশি শক্তি তাঁর নেতৃত্বকে ভয় পায়।
একাধিক বিয়ের বিষয়
সোনারগাঁওয়ের ঘটনার পর একাধিক বিয়ের বিষয়ে তিনি বলেন, ইসলামে চারটি বিয়ে বৈধ এবং এটি একটি পবিত্র ও প্রয়োজনীয় কাজ। বাংলাদেশের সামাজিক পটভূমিতে এ নিয়ে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিকে তিনি কুসংস্কার হিসেবে দেখেন এবং আলেম সমাজের দায়িত্ব হিসেবে এই কুসংস্কার দূর করার পক্ষে সাহসী ভূমিকার কথা বলেন। তিনি আরও বলেন, একাধিক স্ত্রীর সমান অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করা সম্ভব, কারণ এটি কোরআনে নির্দেশিত।
বিএনপি ও আওয়ামী লীগের ভূমিকা
মাওলানা মামুনুল হক বিএনপিকে ইসলামি মূল্যবোধের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা একটি দল হিসেবে দেখেন, যদিও এটি পূর্ণ দক্ষিণপন্থী নয়। তিনি বিএনপির নেত্রী খালেদা জিয়ার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, বিএনপি ইসলামের রাজনীতি না করলেও ইসলাম প্রতিষ্ঠার পরিবেশ সৃষ্টিতে তাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে পাবে না। অন্যদিকে, তিনি আওয়ামী লীগকে ইসলামি রাজনীতির উত্থানের বিরোধী হিসেবে দেখেন। তিনি আওয়ামী লীগের সঙ্গে আলেম সমাজের সখ্যকে কৌশলগত বলে উল্লেখ করেন, যার উদ্দেশ্য ছিল তাদের আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষা এবং তাদের অবস্থান নমনীয় করা।
হেফাজতের ভূমিকা ও নির্বাচন
হেফাজতে ইসলামের ভূমিকা নিয়ে তিনি বলেন, এটি একটি অরাজনৈতিক সংগঠন হওয়ায় নির্বাচনে প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করবে না। তবে সংগঠনের মধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক নেতা থাকায় ইসলামি দলগুলোর দ্বিধাবিভক্তি হেফাজতের ঐক্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তিনি বিএনপির শীর্ষ নেতাদের হেফাজতের আমির ও হাটহাজারী মাদ্রাসার পরিচালকের সঙ্গে সাক্ষাতের বিষয়টিকে ইঙ্গিত হিসেবে দেখেন যে বিএনপি হেফাজতের সমর্থন ও আনুকূল্য চায়।
নারী প্রার্থী ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি
ঐকমত্য কমিশনের ৫-৭% নারী প্রার্থী কোটার বিষয়ে তিনি বলেন, নারীদের জন্য আলাদা কোটা নির্ধারণ বৈষম্যমূলক। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে নারীরা ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা ও স্পিকারের মতো শীর্ষ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন, তাই কোটার প্রয়োজন নেই। তিনি আগামী নির্বাচনকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তনের মাইলফলক হিসেবে দেখেন, যা নতুন বাংলাদেশ গড়ার ভিত তৈরি করবে।
বিএনপির সম্ভাবনা ও ইসলামপন্থীদের ভূমিকা
মাওলানা মামুনুল হক মনে করেন, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ায় বিএনপির ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা বেশি। তিনি বলেন, বিএনপির মধ্যে আওয়ামী লীগের মতো ফ্যাসিবাদী মানসিকতা বা দমন-পীড়নের সামর্থ্য নেই। তিনি ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান থেকে বিএনপির শিক্ষা নেওয়ার কথা উল্লেখ করেন এবং জোর দিয়ে বলেন, বিএনপিকে ইসলামপন্থীদের সমর্থন ও আনুকূল্য নিয়েই রাজনীতিতে টিকে থাকতে হবে, অন্যথায় তাদের জন্য ঝুঁকি তৈরি হবে।
মাওলানা মামুনুল হকের এই বক্তব্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ইসলামি দলগুলোর ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং বিএনপির সঙ্গে তাদের সম্পর্কের গতিশীলতার ইঙ্গিত দেয়। তাঁর মতে, ইসলামি মূল্যবোধ ও আদর্শের ভিত্তিতে দেশের রাজনীতি এগিয়ে নেওয়া সম্ভব এবং এটিই হবে আগামীর বাংলাদেশের পথ।
সূত্র: প্রথম আলো
