মঙ্গলবার, মার্চ ১০, ২০২৬

ইলিশের উৎপাদন কমেছে ৪২ হাজার টন, জেলেরা দিশেহারা

দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশ আসে ইলিশ থেকে।

by ঢাকাবার্তা
ইলিশ

স্টাফ রিপোর্টার ।। 

ইলিশ ধরার মৌসুমে পটুয়াখালীর মহিপুর নদীবন্দরের জেলে সিদ্দিক মাঝি (৫৩) দিশেহারা। সাতবার সমুদ্রে গিয়েও কাঙ্ক্ষিত মাছ পাননি তিনি। সর্বশেষ ১০ দিনে প্রায় ছয় লাখ টাকা খরচ করেও সামান্য লাভ হয়েছে। এর আগে ছয় দফায় মাছ ধরতে গিয়েও খরচ তুলতে পারেননি। আগে বঙ্গোপসাগরের মোহনার কাছেই বড় ইলিশ ধরা পড়ত, এখন যেতে হয় অনেক গভীরে। এতে জ্বালানিসহ অন্যান্য খরচ বেড়েছে। সিদ্দিক মাঝির অভিজ্ঞতায়, “এবারের মতো এমন কম মাছ আগে দেহি নাই। সাত-আষ্ট বছর হইলো মাছের গতিক ভালো না।” তাঁর মতোই হতাশ মহিপুর, আলীপুর, ভোলা ও কক্সবাজারের বহু জেলে।

সরকারি হিসাবে কিছু বছর ইলিশ উৎপাদন বাড়লেও বাস্তবে ক্রমেই কমছে। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ইলিশ আহরণ আগের বছরের তুলনায় ৪২ হাজার টন কমেছে। ২০২২-২৩ সালে যেখানে আহরণ হয়েছিল ৫ লাখ ৭১ হাজার টন, গত মৌসুমে তা নেমে এসেছে ৫ লাখ ২৯ হাজার টনে। অথচ দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশ আসে ইলিশ থেকে। জেলেদের জীবিকা, গ্রামীণ বাজারের প্রাণচাঞ্চল্য ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের জন্য অপরিহার্য এই মাছ এখন নানা সংকটে।

ইলিশ

ইলিশ

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন, উজানের পানির প্রবাহ হ্রাস, নদীতে ডুবোচর বৃদ্ধি, দূষণ, অতিরিক্ত আহরণ ও অনিয়ন্ত্রিত জালের ব্যবহার ইলিশের প্রধান হুমকি। বঙ্গোপসাগরের পানির তাপমাত্রা বাড়ছে, প্রজননের অনুকূল পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। পদ্মা ও মেঘনা অঞ্চলে উজানের প্রবাহ কমায় লবণাক্ততা বাড়ছে, ইলিশের চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। মেঘনা-তেঁতুলিয়া নদীর মোহনা ও আশপাশে অসংখ্য চর ইলিশের স্বাভাবিক যাতায়াত বন্ধ করে দিচ্ছে। নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় নৌযানও চলতে পারছে না।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. শামসুল আলম মনে করেন, ইলিশ অত্যন্ত সংবেদনশীল মাছ। জন্ম সমুদ্রে হলেও ডিম ছাড়তে আসে মিঠাপানিতে। দূষণমুক্ত পরিবেশ না পেলে তারা অন্য পথে চলে যায়। আবহাওয়া অধিদপ্তর ও গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯০১ থেকে ২০২২ সালে দেশের তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। ২০৫০ সালের মধ্যে আরও ১.২ থেকে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়তে পারে। অথচ ইলিশের প্রজননের জন্য আদর্শ তাপমাত্রা ২৬ থেকে ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তাপমাত্রা বেড়ে গেলে ডিম ফোটার হার কমে যায়, বাচ্চা মাছ মারা যায়।

ইলিশ

ইলিশ

দূষণের প্রভাবও মারাত্মক। পদ্মা-মেঘনা নদীতে ইলিশের অভয়াশ্রমে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মান কমেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, নদীর পানিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকসহ সিসা, ক্যাডমিয়াম, পারদ, আর্সেনিকের মতো ভারী ধাতু রয়েছে। শিল্পবর্জ্য, কৃষি কীটনাশক ও প্লাস্টিক আবর্জনা ইলিশের খাদ্যশৃঙ্খলকে ধ্বংস করছে।

অন্যদিকে জেলেদেরও অভিযোগ, আধুনিক জাল যেমন কারেন্ট জাল ও চর জাল নির্বিচারে ব্যবহার হচ্ছে। এতে ছোট মাছ, জাটকা ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে। মাছ প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই ধরা পড়ে যাচ্ছে, ফলে ভবিষ্যতের প্রজননক্ষম মাছও কমে যাচ্ছে।

চাঁদপুরের মৎস্য ব্যবসায়ী আবদুল বারী জমাদারের মতে, শুধু এ বছর নয়, গত চার বছর ধরেই উৎপাদন কমছে। তিনি বলেন, নদীর অনেক অংশে নাব্যতা নেই, ডুবোচরে মাছের পথ বন্ধ। “মাছ আসবে কোথা থেকে?”

সব মিলিয়ে জলবায়ু পরিবর্তন, কম বৃষ্টি, অতিরিক্ত আহরণ, দূষণ, ডুবোচর ও আধুনিক জালের ফাঁদে ইলিশ উৎপাদন তীব্র হুমকির মুখে। জেলেরা বলছেন, আগের মতো আর নৌকা ভর্তি ইলিশ নেই। বৈজ্ঞানিকরা সতর্ক করছেন, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ‘জাতীয় মাছ’ ইলিশের গতি আরও খারাপ হতে পারে।

You may also like

Publisher : Khaled Saifullah Jewel
Editor : Hamim Kefayat
15/1, Paridas Road, Banglabazar, Dhaka 1100, Bangladesh
Contact : +8801712813999,
Mail : news@dhakabarta.net