ডেস্ক রিপোর্ট ।।
পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) দলের প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খান বর্তমানে রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারে বন্দি রয়েছেন। ২০২৩ সালের ৫ আগস্ট থেকে তিনি এই কারাগারে আটক রয়েছেন এবং তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা ফাঁস, সন্ত্রাসবাদ ও অন্যান্য অভিযোগে প্রায় ২০০টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। তবে তার সমর্থক ও দলের নেতারা এই মামলাগুলোকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অংশ বলে দাবি করে আসছেন।
কারাগারে ইমরান খানের অবস্থা
পিটিআই নেতা শেখ ওয়াকাস আকরামের অভিযোগ, ইমরান খানকে আদিয়ালা কারাগারে একটি “ডেথ সেলে” একাকী বন্দি করে রাখা হয়েছে, যা সাধারণত সন্ত্রাসীদের জন্য ব্যবহৃত হয়। তার পরিবার, আইনজীবী এবং রাজনৈতিক সহযোগীদের সঙ্গে দেখা করার অনুমতি প্রায়শই অস্বীকার করা হচ্ছে, যদিও ইসলামাবাদ হাইকোর্ট ২০২৫ সালের ২৪ মার্চ তার জন্য সপ্তাহে দুই দিন (মঙ্গলবার ও বৃহস্পতিবার) পরিবার এবং আইনজীবীদের সঙ্গে সাক্ষাতের অনুমতি দিয়েছিল। তবে দলের অভিযোগ, এই আদেশ পুরোপুরি মানা হচ্ছে না। এছাড়া, তার বই, সংবাদপত্র এবং চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শের সুযোগও সীমিত করা হয়েছে। ২০২৫ সালের ৪ মার্চ, একটি চিকিৎসক দল তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে কারাগারে গিয়েছিল, কিন্তু তার স্বাস্থ্যের বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার দাবি, ইমরান খান কারাগারে কঠিন সময় কাটাচ্ছেন না, বরং “ছুটি উপভোগ করছেন”। তবে পিটিআই এই বক্তব্যকে অস্বীকার করে বলেছে, এটি সরকারের প্রচারণার অংশ। সম্প্রতি ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে পিটিআই দাবি করেছে, ইমরান খানের জীবন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। দলের খাইবার পাখতুনখোয়ার প্রেসিডেন্ট জুনাইদ আকবর সতর্ক করে বলেছেন, সরকার যুদ্ধের অজুহাতে কারাগারে ড্রোন বা মিসাইল হামলার মাধ্যমে ইমরান খানকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। এই আশঙ্কায় দলটি ২০২৫ সালের ৯ মে ইসলামাবাদ হাইকোর্টে তার মুক্তির জন্য আবেদন করেছে।
ইমরান খানের গ্রেপ্তার ও প্রধানমন্ত্রিত্বের অবসান
ইমরান খান ২০১৮ সালের ১৮ আগস্ট থেকে ২০২২ সালের ১০ এপ্রিল পর্যন্ত পাকিস্তানের ১৯তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২২ সালে তার বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনা হয়, যা পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে তার সম্পর্কের অবনতি এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের ঐক্যের কারণে ত্বরান্বিত হয়। ১০ এপ্রিল, জাতীয় পরিষদে অনাস্থা ভোটে তিনি ক্ষমতা হারান। এরপর থেকে তিনি বিভিন্ন মামলায় জড়িয়ে পড়েন এবং ২০২৩ সালের ৫ আগস্ট তোশাখানা মামলায় গ্রেপ্তার হন।

লাহোর হাইকোর্টে ইমরান খান ও বুশরা বিবি। ফাইল ফটো
তোশাখানা মামলায় তাকে ২০২৩ সালের ৫ আগস্ট ৩ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এই মামলায় অভিযোগ ছিল, তিনি প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন রাষ্ট্রীয় উপহার বিক্রি করে লাভ করেছেন এবং এর বিস্তারিত গোপন করেছেন। যদিও ২০২৪ সালের ১৫ নভেম্বর হাইকোর্টে প্রসিকিউশন স্বীকার করে যে এই মামলায় বিচারে ভুল হয়েছে। এছাড়া, আল-কাদির ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ২০২৫ সালের ১৭ জানুয়ারি তাকে ১৪ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এই মামলায় অভিযোগ, তিনি ও তার স্ত্রী বুশরা বিবি ১৯০ মিলিয়ন পাউন্ডের অর্থ ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করেছেন। বুশরা বিবিকে ৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এই রায়ের বিরুদ্ধে তারা ২৭ জানুয়ারি ইসলামাবাদ হাইকোর্টে আপিল করেছেন, যা এখনও বিচারাধীন।
সাম্প্রতিক গুজব ও উদ্বেগ
২০২৫ সালের ১০ মে, সোশ্যাল মিডিয়ায় ইমরান খানের কারাগারে মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়ে। একটি জাল প্রেস রিলিজ, যা পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বলে দাবি করা হয়, এই গুজবের জন্ম দেয়। পাকিস্তানের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় ১১ মে এটিকে “ভুয়া” বলে প্রত্যাখ্যান করে এবং জনগণকে গুজব প্রত্যাখ্যান করার আহ্বান জানায়। পাকিস্তান অবজারভার জানিয়েছে, নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে ইমরান খান জীবিত এবং আদিয়ালা কারাগারে রয়েছেন।

ইমরান খানের ছবি নিয়ে পুলিশি ব্যারিকেটের সামনে সমর্থকরা
ইমরান খানের দুই ছেলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে তার মুক্তির জন্য পাকিস্তানের ওপর চাপ সৃষ্টির আহ্বান জানিয়েছে। এছাড়া, ২০২৫ সালের এপ্রিলে তার তিন বোন—আলিমা খান, উজমা খান ও নুরিন খান—এবং পিটিআই নেতারা কারাগারের বাইরে তার সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য আটক হয়েছিলেন। এই ঘটনা তার সমর্থকদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
রাজনৈতিক প্রভাব
কারাগারে থাকা সত্ত্বেও ইমরান খানের জনপ্রিয়তা কমেনি। তার সমর্থকরা দেশব্যাপী প্রতিবাদ চালিয়ে যাচ্ছেন, এবং পিটিআই গত বছরের নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আসন পেয়েছিল, যদিও সামরিক বাহিনীর সমর্থিত একটি জোট সরকার গঠন করে। ইমরান খান টাইম ম্যাগাজিনে একটি নিবন্ধে লিখেছেন, পাকিস্তানের অস্থিতিশীলতা আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের জন্য হুমকি। তিনি দাবি করেছেন, তার বিরুদ্ধে মামলাগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
সম্প্রতি, প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের সঙ্গে সংলাপের প্রস্তাব গ্রহণ করে ইমরান খান রাজনৈতিক সমঝোতার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে তার শর্তসাপেক্ষে মুক্তির বিষয়ে এখনও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের খবর পাওয়া যায়নি।
