সৈয়দ হাসসান ।।
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে ঘনিষ্ঠ, কিন্তু সীমান্ত হত্যাকাণ্ড ও সাম্প্রতিক উত্তেজনা নতুন করে প্রশ্ন তুলছে এই সম্পর্কের গভীরতা নিয়ে। সম্প্রতি দুই দেশের মধ্যে পতাকা অবমাননার অভিযোগ বড় করে দেখা হচ্ছে। তবে, প্রশ্ন থেকে যায়—পতাকার মর্যাদা কি মানুষের জীবনের চেয়ে বেশি?
কবীর সুমনের কবিতায় উঠে এসেছে সেই প্রশ্ন, যেখানে তিনি লেখেন:
“পতাকার চেয়ে বড় ফেলানির বুক
সেটা তাক করেছিল কার বন্দুক।”
এই লাইনগুলো যেন আমাদেরকে মনে করিয়ে দেয়, সীমান্তে প্রতিনিয়ত ঘটে চলা হত্যাকাণ্ডে পতাকা ও রাষ্ট্রীয় সীমানার পেছনে হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের প্রাণ। ফেলানি আজও সেই নিষ্ঠুরতার প্রতীক। কাঁটাতারে ঝুলে থাকা তার দেহ যেমন আমাদের লজ্জায় ফেলে, তেমনি পতাকা অবমাননার বিতর্ক সেই হত্যার মূল বিষয় থেকে দৃষ্টি সরিয়ে দেয়।
পতাকা ও মানুষের মর্যাদা
পতাকা একটি দেশের পরিচয় ও মর্যাদার প্রতীক। কিন্তু সেই প্রতীকের আড়ালে যদি মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়, তবে সেটি কীভাবে যথার্থ মর্যাদা পেতে পারে? বাংলাদেশের সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটছে, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতির চরম লঙ্ঘন। তার চেয়ে বড় বিষয়,
মানুষের জীবনের গুরুত্ব যেখানে উপেক্ষিত, সেখানে পতাকা রক্ষা করার আদর্শ একধরনের ভণ্ডামি। ফেলানির দেহ যখন কাঁটাতারে ঝুলে ছিল, তখন কারো পতাকা অবমানিত হয়নি, কিন্তু মানবতার প্রতি আঘাত লেগেছিল গভীরভাবে। কবীর সুমন সঠিকভাবেই প্রশ্ন তুলেছেন:
“কার দেশ, কার ফ্ল্যাগ, কার কাঁটাতার
কোথায় রইল মূল ফেলানি আমার।”
সাম্প্রতিক উত্তেজনা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য
সীমান্তে পতাকা অবমাননার অভিযোগের মাধ্যমে দুই দেশের উত্তেজনা বাড়ানো হচ্ছে। এ ধরনের ঘটনাগুলো মূল সমস্যাগুলো আড়াল করার একটি কৌশল। সীমান্ত হত্যাকাণ্ড, মানবপাচার, এবং নিরাপত্তা ইস্যু—এসব বিষয়ে কার্যকর সমাধানের অভাবের কারণেই পতাকার প্রশ্ন বড় করে দেখানো হচ্ছে।
পতাকার মর্যাদা রক্ষার নামে যদি মানুষের অধিকার লঙ্ঘিত হয়, তবে তা রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের চরম ব্যর্থতা। দুই দেশের সরকারকে এই ইস্যুতে কূটনৈতিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে উত্তেজনা কমাতে হবে।
কবিতার প্রতিফলন
কবীর সুমনের কবিতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, রাষ্ট্রীয় প্রতীক কখনোই মানুষের জীবনের চেয়ে বড় হতে পারে না। পতাকা ও সীমানার রাজনীতি যদি মানবিকতাকে বিপন্ন করে, তবে সেই রাজনীতি ও নীতি উভয়কেই পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।
আমাদের একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত সীমান্তে মানবাধিকার নিশ্চিত করা। তখনই পতাকা তার সত্যিকারের মর্যাদা ফিরে পাবে এবং আর কোনো ফেলানিকে কাঁটাতারে ঝুলতে হবে না।
ফেলানি নামটি আজও আমাদের স্মৃতিতে অম্লান
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে কুড়িগ্রামের অনন্তপুর-দিনহাটা সীমান্তের খিতাবেরকুঠি এলাকায় ২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি, কিশোরী ফেলানি কাঁটাতারের বেড়া পেরোনোর সময় বিএসএফের গুলিতে নিহত হয়। তার মৃতদেহ ৫ ঘণ্টা ঝুলে ছিলো সীমান্তের কাঁটাতারে। এই দৃশ্য একদিকে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে নাড়া দিয়েছিল, অন্যদিকে মানবিকতার প্রতি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন ছড়িয়ে দিয়েছিলো বিশ্বময়।।
ভারতীয় বাঙালি সঙ্গীতশিল্পী ও কবি কবীর সুমনের পূর্ণাঙ্গ কবিতাটি নিচে পত্রস্থ করা হলো—
‘কতগুলো উজবুক পতাকা মাড়ালো
বিজ্ঞরা তাই ব্লাড প্রেশার বাড়ালো।
পতাকার চেয়ে বড় ফেলানির বুক
সেটা তাক করেছিল কার বন্দুক।
কাঁটাতারে ঝুলছিল মেয়েটা আমার
দেশের বুলেট দেশপ্রেমের খামার।
কার দেশ কার ফ্ল্যাগ কার কাঁটাতার
কোথায় রইল ঝুলে ফেলানি আমার।
পরের জন্মে মেয়ে আমি আর তুমি
ফ্ল্যাগহীন কোনও দেশে খুঁজে পাবো ভূমি।
আমার সঙ্গে গান গাইবে তুমিও
গাইবে অন্য কোনও
জন্মভূমিও।।’