সবজান্তা সমশের ।।
কাশ্মীর, যাকে প্রায়ই বলা হয় ‘পৃথিবীর স্বর্গ’, শুধু তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যই নয়, বরং তার জটিল রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের জন্যও বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কাশ্মীরের রেজিস্ট্যান্স বা প্রতিরোধ আন্দোলন এই অঞ্চলের মানুষের স্বাধীনতা, স্বায়ত্তশাসন এবং ন্যায়ের জন্য দীর্ঘদিনের সংগ্রামের প্রতীক। এই আন্দোলনের শিকড় গভীর এবং এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে কাশ্মীরি জনগণের আকাঙ্ক্ষা, ভারত ও পাকিস্তানের ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এবং জটিল ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। এই ফিচারে আমরা কাশ্মীর রেজিস্ট্যান্সের উৎপত্তি, তাদের লক্ষ্য, গঠন, কার্যক্রম এবং বর্তমান প্রেক্ষাপট নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
কাশ্মীর রেজিস্ট্যান্স বলতে মূলত কাশ্মীরের সেই গোষ্ঠী এবং ব্যক্তিদের বোঝায়, যারা ভারত-শাসিত জম্মু ও কাশ্মীরে ভারতীয় শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। এই প্রতিরোধ আন্দোলনের লক্ষ্য কাশ্মীরের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার (right to self-determination) প্রতিষ্ঠা করা। কেউ কেউ পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি করে, আবার কেউ পাকিস্তানের সঙ্গে একীভূত হওয়ার পক্ষে। তবে এই আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি হলো কাশ্মীরি জনগণের দীর্ঘদিনের অসন্তোষ, যা ভারতীয় শাসনের অধীনে রাজনৈতিক দমন, অর্থনৈতিক বঞ্চনা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ফলে জন্ম নিয়েছে।
কাশ্মীর রেজিস্ট্যান্স একটি একক সংগঠন নয়, বরং এটি বিভিন্ন গোষ্ঠী, রাজনৈতিক দল এবং ব্যক্তির সমন্বয়ে গঠিত একটি বিস্তৃত আন্দোলন। এর মধ্যে রয়েছে সশস্ত্র জঙ্গি গোষ্ঠী, রাজনৈতিক সংগঠন এবং সাধারণ জনগণ, যারা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের মাধ্যমে তাদের দাবি তুলে ধরে। উল্লেখযোগ্য গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে রয়েছে জম্মু কাশ্মীর লিবারেশন ফ্রন্ট (JKLF), হিজবুল মুজাহিদিন, লস্কর-ই-তইবা, এবং অল পার্টিজ হুরিয়ত কনফারেন্স (APHC)। এই গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে আদর্শগত পার্থক্য থাকলেও, তাদের লক্ষ্য কাশ্মীরের ভারতীয় শাসন থেকে মুক্তি এবং জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠা।
কাশ্মীর রেজিস্ট্যান্সের শিকড় ১৯৪৭ সালের ভারত-পাকিস্তান বিভাজনের সময়ে খুঁজে পাওয়া যায়। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের পর জম্মু ও কাশ্মীরের ভাগ্য নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়। তৎকালীন মহারাজা হরি সিং ভারত বা পাকিস্তানের সঙ্গে যোগদানের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। এ সময় পাকিস্তান-সমর্থিত উপজাতীয় যোদ্ধারা কাশ্মীরে আক্রমণ চালায়, ফলে মহারাজা ভারতের সঙ্গে যোগদানের চুক্তি (Instrument of Accession) স্বাক্ষর করেন। এই ঘটনা প্রথম ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের (১৯৪৭-৪৮) সূচনা করে, যার ফলে কাশ্মীর ভাগ হয়ে যায়। ভারত জম্মু, কাশ্মীর উপত্যকা এবং লাদাখ নিয়ন্ত্রণ করে (প্রায় ৫৫%), আর পাকিস্তান আজাদ কাশ্মীর এবং গিলগিট-বাল্টিস্তান নিয়ন্ত্রণ করে (প্রায় ৩০%)। চীনও অক্সাই চিন অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করে (প্রায় ১৫%)।
জাতিসংঘের প্রস্তাব অনুযায়ী, কাশ্মীরে একটি গণভোটের মাধ্যমে জনগণের মতামত নেওয়ার কথা ছিল, যা কখনোই হয়নি। এই অসম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতি কাশ্মীরি জনগণের মধ্যে অসন্তোষের জন্ম দেয়। ১৯৮০-এর দশকের শেষের দিকে ভারতীয় শাসনের বিরুদ্ধে অসন্তোষ তীব্র আকার ধারণ করে, যা একটি সশস্ত্র বিদ্রোহে রূপ নেয়। এই সময় থেকে কাশ্মীর রেজিস্ট্যান্স আন্দোলন তার বর্তমান রূপ পায়।
কাশ্মীর রেজিস্ট্যান্স আন্দোলন দুটি প্রধান ধারায় বিভক্ত: সশস্ত্র সংগ্রাম এবং শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক আন্দোলন।
সশস্ত্র সংগ্রাম
১৯৮৯ সাল থেকে কাশ্মীরে সশস্ত্র বিদ্রোহ তীব্র হয়ে ওঠে। জম্মু কাশ্মীর লিবারেশন ফ্রন্ট (JKLF) এই সময়ে স্বাধীন কাশ্মীরের দাবিতে সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করে। পরবর্তীতে হিজবুল মুজাহিদিন, লস্কর-ই-তইবা এবং জৈশ-ই-মোহাম্মদ-এর মতো গোষ্ঠী এই সংগ্রামে যোগ দেয়। এই গোষ্ঠীগুলো ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ, বোমা হামলা এবং সশস্ত্র আক্রমণ চালায়। এই সশস্ত্র সংগ্রামে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে সাধারণ নাগরিক, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং জঙ্গিরা।
ভারত সরকার এই গোষ্ঠীগুলোকে সন্ত্রাসবাদী হিসেবে চিহ্নিত করে এবং দাবি করে যে এদের অনেকেই পাকিস্তানের সমর্থন পায়। পাকিস্তান যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে এই অভিযোগ অস্বীকার করে, তবে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয় যে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই এই গোষ্ঠীগুলোকে অর্থ, অস্ত্র এবং প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে।
শান্তিপূর্ণ আন্দোলন
সশস্ত্র সংগ্রামের পাশাপাশি, কাশ্মীরে শান্তিপূর্ণ প্রতিরোধ আন্দোলনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অল পার্টিজ হুরিয়ত কনফারেন্স (APHC) এই ধরনের আন্দোলনের প্রধান প্ল্যাটফর্ম। হুরিয়ত বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের একটি জোট, যারা কাশ্মীরের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের জন্য কাজ করে। তারা হরতাল, বিক্ষোভ, এবং রাজনৈতিক প্রচারণার মাধ্যমে তাদের দাবি তুলে ধরে। উল্লেখযোগ্য নেতাদের মধ্যে রয়েছেন সৈয়দ আলী শাহ গিলানি, মিরওয়াইজ উমর ফারুক এবং ইয়াসিন মালিক।
২০১৯ সালে ভারত সরকার সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিল করে, যা জম্মু ও কাশ্মীরকে বিশেষ মর্যাদা প্রদান করেছিল। এই ধারা বাতিলের ফলে কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন শেষ হয় এবং এটি ভারতের একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত হয়। এই সিদ্ধান্ত কাশ্মীরি জনগণের মধ্যে তীব্র অসন্তোষের জন্ম দেয় এবং প্রতিরোধ আন্দোলনকে নতুন মাত্রা দেয়। সমালোচকরা মনে করেন, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ভারত কাশ্মীরের জনসংখ্যাগত চরিত্র (ডেমোগ্রাফি) পরিবর্তনের চেষ্টা করছে, বিশেষ করে হিন্দু জনগোষ্ঠীকে কাশ্মীরে বসতি স্থাপনের সুযোগ দিয়ে।
৩৭০ ধারা বাতিলের পর কাশ্মীরে কঠোর লকডাউন, ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতা এবং ব্যাপক গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটে। এই পরিস্থিতি প্রতিরোধ আন্দোলনকে আরও জটিল করে তুলেছে, তবে এটি কাশ্মীরি জনগণের মধ্যে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে দমাতে পারেনি।
বর্তমানে কাশ্মীর রেজিস্ট্যান্স আন্দোলন বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। প্রথমত, ভারতের কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সামরিক উপস্থিতি প্রতিরোধ আন্দোলনকে দমন করছে। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতা এই আন্দোলনের জন্য একটি বড় বাধা। তৃতীয়ত, বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে আদর্শগত পার্থক্য এবং ঐক্যের অভাব প্রতিরোধ আন্দোলনকে দুর্বল করছে।
তবে, তরুণ কাশ্মীরিরা সামাজিক মাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক ফোরামে তাদের কণ্ঠস্বর তুলে ধরছে। তারা কাশ্মীরের পরিস্থিতি বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে সক্ষম হচ্ছে, যা এই আন্দোলনকে নতুন গতি দিচ্ছে।
কাশ্মীর রেজিস্ট্যান্স আন্দোলনের সঙ্গে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগও জড়িত। ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, নির্বিচারে গ্রেপ্তার, এবং পেলেট গানের ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে সাধারণ নাগরিকদের উপর হামলা এবং সন্ত্রাসী কার্যক্রমের অভিযোগ রয়েছে। এই পরিস্থিতি কাশ্মীরকে একটি মানবিক সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
কাশ্মীর রেজিস্ট্যান্স কেবল একটি রাজনৈতিক আন্দোলন নয়, এটি একটি জনগোষ্ঠীর পরিচয়, আকাঙ্ক্ষা এবং ন্যায়ের জন্য সংগ্রামের প্রতীক। এই আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে ভারত, পাকিস্তান এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পদক্ষেপের উপর। কাশ্মীরের শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য প্রয়োজন সংলাপ, পারস্পরিক সমঝোতা এবং কাশ্মীরি জনগণের ইচ্ছার প্রতি সম্মান। পাহালগামের মতো কাশ্মীরের নৈসর্গিক সৌন্দর্য যেন শান্তি ও সমৃদ্ধির প্রতীক হয়ে ওঠে, সেটাই হোক সবার প্রত্যাশা।
