সৈয়দ হাসসান ।।
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের পরামর্শে খলিলুর রহমানকে নতুন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি এখন থেকে ‘জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং রোহিঙ্গা সমস্যাবিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ’ হিসেবে কাজ করবেন। আজ বুধবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে এক প্রজ্ঞাপনে এই তথ্য জানানো হয়। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে এই প্রজ্ঞাপনে স্বাক্ষর করেছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিবের রুটিন দায়িত্বে থাকা সচিব (সমন্বয় ও সংস্কার) জাহেদা পারভীন।
খলিলুর রহমানের নতুন পদবি হলো ‘জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং রোহিঙ্গা সমস্যাবিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ’। এর পাশাপাশি তিনি প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূসকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত দায়িত্বেও সাহায্য করবেন।
এটি খলিলুর রহমানের ক্যারিয়ারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক, যা তাঁর একাধিক দায়িত্বের দায়িত্বভার বৃদ্ধি করেছে এবং দেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
খলিলুর রহমান বাংলাদেশের একজন শীর্ষস্থানীয় কূটনীতিক এবং অর্থনীতিবিদ। ১৯৭৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করার পর, তিনি ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (পররাষ্ট্র) ক্যাডারে যোগ দেন। এরপর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের টাফটস এবং হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন ও কূটনীতিতে এমএ এবং অর্থনীতিতে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।
তাঁর কূটনৈতিক ক্যারিয়ার শুরু হয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে, যেখানে তিনি দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের সদস্য হিসেবে এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৫ সালে তিনি জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে বদলি হন। ১৯৯১ সালে তিনি জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সম্মেলন (আঙ্কটাড)-এ বিশেষ উপদেষ্টা হিসেবে যোগদান করেন এবং ২০০১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি লতিফুর রহমানের একান্ত সচিব হিসেবে কাজ করেন।

খলিলুর রহমান
খলিলুর রহমান জাতিসংঘে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় ছিলেন। তিনি জাতিসংঘের শীর্ষ কর্মকর্তা হিসেবে দক্ষিণ এশিয়ার দরিদ্র দেশগুলোর পক্ষে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। বিশেষ করে, তিনি Least Developed Countries (LDCs) বিষয়ক জাতিসংঘের রিপোর্ট এবং পরিকল্পনা তৈরিতে ভূমিকা রেখেছেন। তিনি ২০০১ সালে ব্রাসেলস LDC সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন, যেখানে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য কোটামুক্ত ও শুল্কমুক্ত বাণিজ্য প্রবাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।
তিনি জাতিসংঘে Non-Tariff Barriers to Trade সংক্রান্ত ইন্টারএজেন্সি গ্রুপের চেয়ারপারসনও ছিলেন, যেখানে তাঁর নেতৃত্বে বাণিজ্যিক বাধা সমাধান করা হয়। তাঁর এসব উদ্যোগ বাংলাদেশের কূটনীতির অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
গত বছর নভেম্বরের ১৯ তারিখ, খলিলুর রহমানকে রোহিঙ্গা সংকটের বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। জাতিসংঘের মহাসচিবকে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে নিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেন, যা বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়। এই উদ্যোগের ফলে রোহিঙ্গা সংকট আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরো গুরুত্ব পেয়েছে এবং বাংলাদেশের কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে পরিগণিত হয়েছে।
তাঁর নেতৃত্বে, বাংলাদেশ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করতে সক্ষম হয়েছে এবং রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য মিয়ানমারের প্রতি চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব হয়েছে।
খলিলুর রহমানের কাজের শৈলী এবং কূটনীতির প্রতি তাঁর অবদান বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। তাঁর দক্ষতা এবং কূটনৈতিক শক্তি দেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। তাঁর সহায়তায় বাংলাদেশ এখন অনেক বেশি সক্রিয় এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।

রভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে খলিলুর রহমান, ব্যাংককে বিমসটেক সম্মেলন ২০২৫-এ তোলা ছবি।
বিশেষ করে, তাঁর ব্যাংকক সফরের সময় ভারতীয় জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সাথে এক ঘণ্টার বৈঠক এবং মিয়ানমারের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী সঙ্গে ১৫ মিনিটের আলোচনা বাংলাদেশের কূটনীতির জন্য অনেক বড় সাফল্য নিয়ে এসেছে।
জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে খলিলুর রহমান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত বিষয়েও কার্যক্রম চালাবেন, যা দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর নেতৃত্বে, বাংলাদেশ নতুন কৌশল গ্রহণ করতে পারে যা নিরাপত্তা এবং পররাষ্ট্রনীতি উভয়ের ক্ষেত্রে সঠিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করবে।
খলিলুর রহমানের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং রোহিঙ্গা সমস্যাবিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে নিয়োগ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি নতুন পর্বের সূচনা করেছে। তাঁর নেতৃত্বে, বাংলাদেশের কূটনীতি এবং নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে, যা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
