মঙ্গলবার, এপ্রিল ১৪, ২০২৬

লোকসংগীতের বরেণ্যশিল্পী ফরিদা পারভীন আর নেই

সংগীতে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ১৯৮৭ সালে পান একুশে পদক।

by ঢাকাবার্তা
ফরিদা পারভীন

স্টাফ রিপোর্টার ।। 

লোকসংগীতের বরেণ্যশিল্পী ফরিদা পারভীন আর নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। শনিবার রাত ১০টা ১৫ মিনিটে রাজধানীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭১ বছর। তিনি স্বামী ও চার সন্তান রেখে গেছেন।

বরেণ্য এ শিল্পীর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন হাসপাতালটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আশীষ কুমার চক্রবর্তী।

দীর্ঘদিন ধরে কিডনি জটিলতায় ভুগছিলেন ফরিদা পারভীন। নিয়মিত ডায়ালাইসিসের অংশ হিসেবে গত ২ সেপ্টেম্বর তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেদিন ডায়ালাইসিসের পর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। পরবর্তীতে অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে ভেন্টিলেশনে রাখা হয়। চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে শেষ পর্যন্ত না–ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন এই কিংবদন্তি শিল্পী।

১৯৫৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর নাটোরের সিংড়া থানায় জন্ম নেওয়া ফরিদা পারভীন সংগীতের ভুবনে পথচলা শুরু করেন মাত্র ১৪ বছর বয়সে। ১৯৬৮ সালে রাজশাহী বেতারে নজরুলসংগীত শিল্পী হিসেবে তালিকাভুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর পেশাদার সংগীতজীবনের সূচনা। যদিও শুরুটা নজরুলসংগীত ও আধুনিক গান দিয়ে, পরবর্তীতে তিনি হয়ে ওঠেন লালনসংগীতের জীবন্ত কিংবদন্তি। সাধক মোকছেদ আলী সাঁইয়ের কাছে তালিম নেওয়ার পর তিনি লালনের গান গাওয়া শুরু করেন এবং এই ধারাতেই খুঁজে পান নিজের শিল্পীসত্তা।

লালনগীতি গাওয়ার প্রসঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, কুষ্টিয়ার এক হোমিও চিকিৎসকের অনুরোধে লালনের গান শেখা শুরু করেন। প্রথম গান ছিল ‘সত্য বল সুপথে চল’। সেই গান দিয়েই তিনি নতুন দিশা খুঁজে পান এবং ধীরে ধীরে লালনের আধ্যাত্মিক দর্শনে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হন। এরপর মোকছেদ আলী সাঁইয়ের পাশাপাশি খোদা বক্স সাঁই, ব্রজেন দাস, ইয়াছিন সাঁইসহ লালনসঙ্গীতের অন্যান্য গুরুজনের কাছ থেকেও তালিম নেন।

৫৫ বছরের সংগীতজীবনে ফরিদা পারভীনের অবদান অসামান্য। স্বাধীনতার পর তিনি ঢাকায় চলে আসেন এবং বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ বেতার, টেলিভিশন ও বিশ্বমঞ্চে লালনের গান পরিবেশন করেন। জাপান, সুইডেন, ডেনমার্ক, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ নানা দেশে তিনি লালনের বাণী ও দর্শন ছড়িয়ে দেন।

সংগীতে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি পেয়েছেন বহু পুরস্কার। ১৯৮৭ সালে একুশে পদক, ১৯৯৩ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (নারী কণ্ঠশিল্পী) এবং ২০০৮ সালে জাপানের ফুকুওয়াকা পুরস্কার অর্জন করেন। তাঁর গাওয়া কিছু আধুনিক ও দেশাত্মবোধক গানও জনপ্রিয়তা পায়, যেমন—‘তোমরা ভুলে গেছ মল্লিকাদির নাম’, ‘এই পদ্মা এই মেঘনা’ ইত্যাদি।

শুধু শিল্পী হিসেবেই নয়, শিক্ষক হিসেবেও তিনি ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ। নতুন প্রজন্মকে লালনের গান শেখাতে প্রতিষ্ঠা করেন ‘অচিন পাখি স্কুল’।

শৈশব থেকে গান শিখেছেন নানা ওস্তাদের কাছে—কমল চক্রবর্তী, মীর মোজাফফর আলী প্রমুখের কাছে। রাজশাহী বেতারের নজরুলসংগীত শিল্পী থেকে শুরু করে বিশ্বের দরবারে লালনের গান পৌঁছে দেওয়ার পথচলায় তিনি হয়েছেন ‘লালনসংগীতের সম্রাজ্ঞী’।

দেশ-বিদেশে অগণিত মানুষের ভালোবাসা পাওয়া এই শিল্পী বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

You may also like

Publisher : Khaled Saifullah Jewel
Editor : Hamim Kefayat
15/1, Paridas Road, Banglabazar, Dhaka 1100, Bangladesh
Contact : +8801712813999,
Mail : news@dhakabarta.net