স্টাফ রিপোর্টার ।।
সারা দেশে ১২–৫৯ মাস বয়সী শিশুদের ৩৮ শতাংশের শরীরে সিসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। রাজধানী ঢাকায় এ হার ৬৫ শতাংশ। সিসা শিশুদের মস্তিষ্কসহ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের বিকাশ ব্যাহত করে। বিশ্বব্যাপী সিসাদূষণে মৃত্যুর সংখ্যা ম্যালেরিয়া, যক্ষ্মা ও এইচআইভিতে মোট মৃত্যুর চেয়েও বেশি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিসাদূষণ ঠেকাতে জরুরি ভিত্তিতে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর শেরে বাংলা নগরের ইউনিসেফ হাউসে বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০২৫–এর প্রাথমিক ফলাফল প্রকাশ করা হয়। জরিপটি যৌথভাবে পরিচালনা করেছে ইউনিসেফ এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। ফলাফল উপস্থাপন করেন ইউনিসেফ বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স। শিশুর জীবনমান, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও অধিকারের বিভিন্ন সূচকে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি এই জরিপে উঠে এসেছে। কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি দেখা গেলেও বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকে অবনতি উদ্বেগ তৈরি করেছে।
- দেশে ১২–৫৯ মাস বয়সী ৩৮% শিশুর দেহে সিসার উপস্থিতি
- ঢাকায় সিসাদূষণের হার ৬৫%, কিছু এলাকায় আরও বেশি
- প্রসাধনী, মসলা ও খেলনায় উচ্চমাত্রায় সিসা শনাক্ত
- শিশুশ্রম বেড়েছে; ১২ লাখ নতুন শিশু শ্রমে যুক্ত
- ৮৬% শিশু নিজ বাড়িতে সহিংস শাস্তির শিকার—দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ
- ২৪% শিশু খর্বকায়, ১৩% কৃশকায়; রক্তশূন্যতায় ভোগা শিশু ৪৩.৯%
- দেশের ৫৩.১% অন্তঃসত্ত্বা নারী অ্যানিমিয়ায় আক্রান্ত
- কিশোরী মায়ের সংখ্যা প্রতি হাজারে ৯২
- সিসাদূষণে শিশুদের মস্তিষ্ক ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের বিকাশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়
এমআইসিএস ২০২৫-এর ফলাফলে সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে বিষাক্ত সিসাদূষণ নিয়ে। রানা ফ্লাওয়ার্স জানান, ঢাকায় ৬৫ শতাংশ শিশু সিসাদূষণের শিকার। শহরের কিছু এলাকায় এ হার আরও বেশি। দৈনন্দিন ব্যবহারের প্রসাধনী, মসলা ও শিশুদের খেলনাতেও উচ্চ মাত্রায় সিসা পাওয়া গেছে, যা ভবিষ্যতের উৎপাদনশীলতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে শিশুশ্রম বেড়েছে। ২০১৯ সালের তুলনায় আরও ১২ লাখ শিশু নতুন করে শ্রমে যুক্ত হয়েছে। শিশুশ্রমের হার এখন ৯ দশমিক ২ শতাংশ। শিশুদের ওপর পরিবারের সহিংস আচরণও উদ্বেগজনক; ৮৬ শতাংশ শিশু নিজ বাড়িতেই সহিংস শাস্তির শিকার হচ্ছে—দক্ষিণ এশিয়ায় যা সর্বোচ্চ। ২০–২৪ বছর বয়সী বিবাহিত নারীদের ৪৭ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছরের আগে (২০১৯ সালে ছিল ৫১ শতাংশের বেশি)। জন্মনিবন্ধনের হার ৫৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
জরিপে দেখা যায়, দেশে ১২–৫৯ মাস বয়সী ১৩ শতাংশ শিশু উচ্চতার তুলনায় কৃশকায়। তীব্র অপুষ্টির কারণে তাদের দ্রুত ওজন কমে যায়, যা মৃত্যুঝুঁকি বাড়ায়। বয়সের তুলনায় খর্বকায় শিশুর হার ২৪ শতাংশ। আর বয়স অনুযায়ী যাদের ওজন কম হওয়ার ঝুঁকি আছে, এমন শিশু ২৩ শতাংশ। রক্তশূন্যতায় ভোগা শিশুর হার ৪৩ দশমিক ৯ শতাংশ।
অন্তঃসত্ত্বা নারীদের অবস্থাও উদ্বেগজনক। দেশের ৫৩ দশমিক ১ শতাংশ অন্তঃসত্ত্বা নারী রক্তশূন্যতায় ভুগছেন। তাদের মধ্যে প্রায় ৮ শতাংশের শরীরে সিসার মাত্রা সহনশীল সীমার অনেক বেশি। প্রসবের ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের হার ৭৫ শতাংশ ছাড়িয়েছে। প্রতি হাজারে কিশোরী মায়ের সংখ্যা ৯২।
‘পিজি পার্টনারশিপ ফর আ লেড ফ্রি ফিউচার’-এর পরিচালক আবদুল্লাহ ফাদিল সংবাদ সম্মেলনে বলেন, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে আট কোটি শিশু সিসাদূষণের শিকার। সিসা শিশুদের জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। এটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গের বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং মস্তিষ্কের বিকাশে গুরুতর প্রভাব ফেলে।
