বৃহস্পতিবার, মার্চ ৫, ২০২৬

বৈভব সূর্যবংশী: শচীন-কোহলির সাম্রাজ্যে ‘এক নতুন ঝড়’

by ঢাকাবার্তা
বৈভব সূর্যবংশী, বিরাট কোহলি ও শচীন টেন্ডুলকার। গ্রাফিক, গালা

হামীম কেফায়েত ।। 

২০২৫ সালের ২৮ এপ্রিল। জয়পুরের সওয়াই মানসিংহ স্টেডিয়ামে ৩০ হাজার দর্শকের নিশ্চুপ স্তব্ধতা ভেঙে উঠল উন্মাদ উল্লাসে। বৈভব সূর্যবংশী, মাত্র ১৪ বছর বয়সী এক কিশোর, দুনিয়াকাঁপানো আফগান স্পিনার রশিদ খানের বলে মিড-উইকেটে বিশাল ছক্কা হাঁকিয়ে প্রথম আইপিএল শতরান পূর্ণ করলেন। ৩৮ বলে ১০১ রান— ৭টি চার, ১১টি ছক্কা, বাউন্ডারি থেকেই ৯৪ রান। গুজরাট টাইটান্সের বোলাররা, ইশান্ত শর্মা থেকে মোহাম্মদ সিরাজ, রশিদ থেকে ওয়াশিংটন সুন্দর, অসহায়ভাবে দেখলেন তাদের বোলিং ধ্বংস হতে।

সেই ধ্বংসলীলা ছিলো শচীন টেন্ডুলকারের ১৬ বছর বয়সে পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট অভিষেকের নির্ভীকতার প্রতিধ্বনি, ছিলো বিরাট কোহলির ২০১৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৮২* রানের আগ্রাসী আধিপত্যের একটি ‘কিশোর সংস্করণ’। কিন্তু বৈভব কি কেবল শচীন বা কোহলির ছায়া? অবশ্যই না! তিনি এমন এক  প্রতিভা, যিনি একাই শচীন ও কোহলির সম্মিলিত রান ও সেঞ্চুরির রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবেন অনায়াসে, ছক্কার রেকর্ডে শীর্ষে পৌঁছবেন এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা না রেখেই জনপ্রিয়তার রেসে প্রভাবপ্রতিপত্তি নিয়ে উঠে পড়েছেন বলে বিশ্বাস করি।

বৈভব সূর্যবংশীর সেঞ্চুরি উদযাপন

বৈভব সূর্যবংশীর সেঞ্চুরি উদযাপন

বৈভব সূর্যবংশীর গল্পের শুরুটা বিহারের সমস্তিপুরের তাজপুরে। মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারের সন্তান বৈভব মাত্র ৪ বছর বয়সে বাবা সঞ্জীবের হাত ধরে ক্রিকেট ব্যাট তুলে নেন। সাড়ে ৭ বছর বয়সে তিনি পটনার একটি ক্রিকেট অ্যাকাডেমিতে যোগ দেন। কোচ সৌরভ কুমার প্রথম দেখেই অবাক হয়ে যান— এত কম বয়সে বৈভবের ব্যাটিংয়ে ছিল অসাধারণ টাইমিং এবং নির্ভীকতা। প্রতিদিন ১০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে, কাকভোরে মায়ের তৈরি খাবার সঙ্গে করে এনে বৈভব কোচ মণীশ ওঝার অধীনে প্রশিক্ষণ নিতেন। “যেদিন আসত, অন্তত ৫০০ বল খেলত,” বললেন কোচ মণীশ বলেন।

রঞ্জি ট্রফিতে বৈভবের অভিষেক ঘটে ১২ বছর ২৮৪ দিন বয়সে। গত বছর অনূর্ধ্ব-১৯ লাল বলের ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৫৮ বলে শতরান করে তিনি ভারতের দ্রুততম শতরানের রেকর্ড গড়েন। ২০২৪-এর আইপিএল নিলামে রাজস্থান রয়্যালস তাকে ১.১ কোটি টাকায় কিনে নেয়। সমালোচকরা ভ্রু কুঁচকালেও, রাহুল দ্রাবিড়ের বিশ্বাস ছিল অটুট। “বৈভবকে আমরা পূর্ণ ক্রিকেটার হিসেবে গড়ে তুলব,” বলেছিলেন ভারতের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ‘দ্য ওয়াল’।

বৈভব সূর্যবংশীর সেঞ্চুরি উদযাপন

বৈভব সূর্যবংশীর সেঞ্চুরি উদযাপন

১৯৮৯ সালে ১৬ বছর বয়সে শচীন পাকিস্তানের আবদুল কাদির, ইমরান খান, ওয়াসিম আকরামদের মতো বোলারদের মুখোমুখি হয়ে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। সেদিনই খেলেছিলেন ওয়াকার ইউনিসকেও, যার সঙ্গে একই দিনে অভিষেক হয়েছিলো। বৈভব ১৪ বছর বয়সে আইপিএলে প্রথম বলে শার্দূল ঠাকুরের বিরুদ্ধে ছক্কা মেরে সেই নির্ভীকতার প্রতিধ্বনি তৈরি করেন। গুজরাট টাইটান্সের বিপক্ষে তার ৩৮ বলে ১০১ রানের ইনিংসে ৭টি চারে শচীনের ক্লাসিক্যাল টেকনিকের ছোঁয়া ছিল—ওয়াশিংটন সুন্দরের বলে এক্সট্রা কভারে বাউন্ডারি বা ফ্লিক শটে ছিল শচীনের টাইমিং।

তার মানসিক শক্তি শচীনের প্রথম টেস্টের সঙ্গে তুলনীয়। ওয়াকারের বাউন্সারে নাক ফেটে গেলেও শচীন ব্যাটিং চালিয়ে যান। বৈভবও ২১০ রানের চাপের মুখে বলেন, “আমি মাঠ বা বোলার দেখি না, স্রেফ বল দেখি।” ১৪ বছর বয়সে এই দৃঢ়তা তাকে শচীনের ২৪ বছরের ক্যারিয়ারের মতো দীর্ঘস্থায়ী উত্তরাধিকারের পথে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। ২০২৩ সালে গর্ডন গ্রিনিজকে এক সাক্ষাৎকারে বলা হয়েছিলো পেশাদার ক্রিকেটার হতে চাইলে এবং গুরুত্বের সঙ্গে ক্রিকেট নিতে আগ্রহী ১২-১৫ বছর বয়সী ছেলে কিংবা মেয়ের জন্য আপনার পরামর্শ কী? উত্তরে ক্যারিবীয় কিংবদন্তী বলেছিলেন, ‘বলে নজর রাখো’। ক্রিকেটে ক্ল্যাসিক্যাল সময়ের সেরা সেই ওপেনারকে কি শুনতে পেয়েছিলেন বৈভব!

যশস্বী জয়সওয়ালের সঙ্গে বৈভব সূর্যবংশী

যশস্বী জয়সওয়ালের সঙ্গে বৈভব সূর্যবংশী

কিন্তু বৈভব শুধু শচীনের প্রতিমূর্তি নন। তিনি রান ও সেঞ্চুরির দৌড়ে শচীনের ১০০টি আন্তর্জাতিক সেঞ্চুরি (৫১ টেস্ট, ৪৯ ওডিআই) ছাড়িয়ে যাওয়ার এক দৃঢ় আশ্বাস। তার ১৪ বছর বয়সে শতরান করার ক্ষমতা—আইপিএলে ৩৫ বলে, অনূর্ধ্ব-১৯-এ ৫৮ বলে—দেখায় যে সে শচীনের রেকর্ড ভাঙার প্রবল দাবিদার।

বৈভবের ব্যাটিংয়ে বিরাট কোহলির আগ্রাসন ও মাঠে আধিপত্য স্পষ্ট। গুজরাটের বিপক্ষে তিনি ইশান্ত শর্মার এক ওভারে ২৬ রান (৩ ছক্কা, ২ চার) এবং কারিম জানাতের ওভারে ৩০ রান (৩ ছক্কা, ৩ চার) তুলে প্রতিপক্ষকে হতাশ করেন। এটা কোহলির ২০১৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৮২* (৫১ বল) বা ২০১৬ আইপিএলে গুজরাট লায়ন্সের বিপক্ষে ১০০* (৬৩ বল) এর মতো আগ্রাসী আধিপত্যের সুস্পষ্ট ও প্রবল ছায়া।

বৈভবের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ কোহলির সঙ্গে মেলে। ওয়াশিংটন সুন্দরের বলে বাউন্ডারি মেরে তিনি জার্সির পিঠে নিজের নাম দেখান। রশিদ খানের বলে শতরান পূর্ণ করে হেলমেট খুলে ডাগআউটের দিকে ছুটে যান, যা কোহলির ভিড়ের দিকে তাকিয়ে ব্যাট তুলে উদযাপনের সঙ্গে তুলনীয়। তার ফিটনেস—মাঠে ক্ষিপ্র রানিং, দ্রুত ফিল্ডিং—কোহলির ফিটনেস বিপ্লবের সঙ্গে অনেকটাই মিলে যায়।

কিন্তু বৈভব কোহলির শৃঙ্খলাবদ্ধ আগ্রাসনের সঙ্গে কৈশোরের দুঃসাহস মিশিয়েছেন। সেঞ্চুরির আগমুহূর্তে রশিদ খানের মতো বিশ্বের সেরা স্পিনারকে ছক্কা মেরে তিনি চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন, তার নির্ভীকতা কোহলির আগ্রাসনকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। আর রান ও সেঞ্চুরির দৌড়ে তিনি কোহলির ৮০+ সেঞ্চুরি (৫০ ওডিআই, ২৯ টেস্ট, ১ টি-টোয়েন্টি) ছাড়িয়ে যাওয়া কঠিন কিছু নয়। তার ৩৫ বলে শতরান এবং চাপের মুখে ২১০ রান তাড়া করার ক্ষমতা এই সম্ভাবনার সরল প্রমাণ।

গুজরাটের বিপক্ষে বৈভবের রাজকীয় ইনিংসটি কেবল একটি ইনিংস ছিলো না, এটি ছিল রেকর্ডের মহোৎসব। তিনি টি-টোয়েন্টিতে সবচেয়ে কম বয়সে শতরান করেছেন (১৪ বছর ৩২ দিন), আইপিএলের দ্রুততম ভারতীয় শতরান (৩৫ বল) এবং ১৮ বছরের কম বয়সে সবচেয়ে বেশি ছক্কা (১৬টি)। এই রেকর্ডগুলো শুধু তার প্রতিভার প্রমাণ নয়, তার শচীন ও কোহলির সম্মিলিত রান ও সেঞ্চুরির রেকর্ড ভাঙার খেলায় অভিযাত্রার ইঙ্গিত।

শচীনের ১০০টি সেঞ্চুরি এবং কোহলির ৮০+ সেঞ্চুরি ক্রিকেটের ইতিহাসে অতুলনীয়। কিন্তু বৈভবের ১৪ বছর বয়সে শতরান করার গতি— আইপিএলে ৩৫ বলে, অনূর্ধ্ব-১৯-এ ৫৮ বলে— দেখায় যে তিনি একাই এই দুই কিংবদন্তির সম্মিলিত রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারেন। যদি তিনি এই হারে ও ছন্দে খেলে চলেন, ২০ বছর বয়সের মধ্যেই তিনি ২০টি সেঞ্চুরি করে ফেলতে পারেন, যা শচীন বা কোহলির কম বয়সের রেকর্ডের চেয়ে এগিয়ে।

বৈভবের লক্ষ্য হয়ে উঠতে পারে কেবল রান বা সেঞ্চুরি নয়। তিনি শচীন (টেস্টে ৬৯, ওডিআই-এ ১৯৫ ছক্কা) বা কোহলি (টি-টোয়েন্টিতে ১২৩, ওডিআই-এ ১৫০+ ছক্কা) যেখানে শীর্ষে পৌঁছতে পারেননি, সেখানে তিনি ছক্কার রেকর্ডে রাজত্বও তাকি হাতছানি দিয়ে ডাকছে। ইতিমধ্যে ১৬টি ছক্কা মেরে তিনি ১৮ বছরের কম বয়সে রেকর্ড গড়েছেন। গুজরাটের বিপক্ষে ১১টি ছক্কা জানান দেয়, তিনি ক্রিস গেইল (টি-টোয়েন্টিতে ১০০০+ ছক্কা) বা রোহিত শর্মার (টি-টোয়েন্টিতে ৫০০+ ছক্কা) মতো ছক্কা-রাজাদের বুকেও কাপন ধরাতে প্রস্তুত। ১৮ বছর হতে তার চার বছর বাকি— এই সময়ে তার ছক্কার সংখ্যা গেইলের রেকর্ডের কাছাকাছি পৌঁছলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

শচীন ১৯৯০-এর দশকে ভারতের ক্রিকেট ভক্তদের হৃদয়ে রাজত্ব করেছেন। কোহলি ২০১০-এর দশকে বিশ্বব্যাপী ফ্যানবেস তৈরি করেছেন। কিন্তু বৈভব আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা না রেখেই শতকোটি মানুষের দেশে জনপ্রিয়তার শীর্ষ রেসে পা রেখেছেন। গুজরাটের বিপক্ষে তার শতরানের পর সওয়াই মানসিংহ স্টেডিয়ামে ৩০ হাজার দর্শক উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। হুইলচেয়ারে বসা রাহুল দ্রাবিড়, উঠে দাঁড়িয়ে তাকে অভিবাদন জানান। ইতোমধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ভক্তরা তাকে “বেবি বস” ডাকতে শুরু করে দিয়েছে।

১.১ কোটি টাকার নিলাম মূল্য এবং তার ‘কৈশোর’ তাকে ক্রিকেট বিশ্বের আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে তার জনপ্রিয়তা শচীনের ১৯৯৮ ডেজার্ট স্টর্ম বা কোহলির ২০১৬ আইপিএলের ফ্যান ফলোয়িংয়ের সমান্তরালে পৌঁছতে খুব বেশি বছর সময় লাগবে না। “আইপিএলে খেলা এবং শতরান করা আমার স্বপ্ন ছিল,” বলেন বৈভব। তার এই স্বপ্ন ভক্তদের হৃদয়ে নতুন আকাঙ্ক্ষা জাগিয়েছে।

তবে— বৈভবের পথ মসৃণ নয়। আইপিএল নিলামের পর সমালোচকরা, যেমন সুনীল গাভাস্কার ও বীরেন্দ্র শেবাগ বলেছিলেন, “কোটিপতি হয়ে তার মাথা ঘুরে গেছে।” বেঙ্গালুরুর বিপক্ষে ব্যর্থতার পর এই সমালোচনা আরও তীব্র হয়। কিন্তু বৈভব তার ব্যাট দিয়ে জবাব দিতে খুব একটা বিলম্ব করেনি। গুজরাটের বিপক্ষে ৩৫ বলে শতরান এবং জার্সির নাম দেখানো ছিল সমালোচকদের প্রতি নীরব নিশ্চিদ্র প্রতিবাদ।

তবু, খ্যাতির চাপ এবং ধারাবাহিকতা তার কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা তিদে পারে। কিন্তু রাহুল দ্রাবিড়ের গাইডেন্স এবং তার মানসিক শক্তি তাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে আমার বিশ্বাস। “গত তিন-চার মাসের কঠোর পরিশ্রমের ফল পাচ্ছি,” বলেছেনও বৈভব। এই পরিশ্রম তাকে শচীন-কোহলির রেকর্ড ভাঙার পথে আত্মবিশ্বাসী রাখবে।

বৈভব সূর্যবংশী কেবল একজন ক্রিকেটার নন, আমার মনে হচ্ছে তিনি একটি ঝড়। শচীনের কম বয়সের নির্ভীকতা, কোহলির আগ্রাসী আধিপত্য, এবং তার নিজস্ব কৈশোরের দুঃসাহস নিয়ে তিনি ক্রিকেটের নতুন ইতিহাস লিখছেন…। রান ও সেঞ্চুরিতে তিনি শচীন ও কোহলির সম্মিলিত রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবেন। ছক্কার রেকর্ডে তিনি গেইল ও রোহিতের মতো শীর্ষে পৌঁছবেন। আর জনপ্রিয়তার কথা কী বলবো, কেমনে ব্যাখ্যা করবো? ভালো হয়, সময়ের হাতেই ছেড়ে দিলাম।

চতুর্দশী এই কিশোর বিশ্ব ক্রিকেটের আধুনিক ভবিষ্যৎ। তার ব্যাটে শুধু রান বা ছক্কা নয়, ভারতীয় ক্রিকেটের নতুন স্বপ্ন লেখা হচ্ছে। বৈভব সূর্যবংশী শচীন ও কোহলির শুধুই উত্তরাধিকারী নন— তিনি তাদের সাম্রাজ্যে ‘এক নতুন ঝড়’।

লেখক : সম্পাদক, ঢাকাবার্তা

You may also like

Publisher : Khaled Saifullah Jewel
Editor : Hamim Kefayat
15/1, Paridas Road, Banglabazar, Dhaka 1100, Bangladesh
Contact : +8801712813999,
Mail : news@dhakabarta.net