শনিবার, মার্চ ১৪, ২০২৬

কী কথা হলো মোদির সঙ্গে

প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানিয়েছেন, অধ্যাপক ইউনূস বৈঠকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রসঙ্গ তুলেছেন।

by ঢাকাবার্তা
মুহাম্মদ ইউনূস ও নরেন্দ্র মোদি

বিশেষ প্রতিনিধি ।।

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মধ্যে প্রথমবারের মতো দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে আজ শুক্রবার থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে। ষষ্ঠ বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলন শেষে সাংরিলা হোটেলে এই বৈঠকে দুই নেতা ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের উন্নয়ন, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, সীমান্ত হত্যা, এবং পানি বণ্টনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা করেছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সম্পর্ক নষ্ট করে এমন বক্তব্য পরিহার করার আহ্বান জানিয়েছেন এবং একটি গণতান্ত্রিক, স্থিতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। বৈঠকটিকে উভয় পক্ষই গঠনমূলক ও ফলপ্রসূ হিসেবে বর্ণনা করেছে।

বৈঠকের হাইলাইটস

  • বৈঠকের স্থান ও সময়: শুক্রবার, ৪ এপ্রিল ২০২৫, থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের সাংরিলা হোটেলে ষষ্ঠ বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলন শেষে দুপুরে বৈঠক অনুষ্ঠিত।
  • প্রথম সাক্ষাৎ: অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর অধ্যাপক ইউনূসের সঙ্গে মোদির প্রথম দ্বিপক্ষীয় আলোচনা।
  • সম্পর্ক উন্নয়নে আহ্বান: মোদি ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক খারাপ করে এমন বক্তব্য পরিহার করার আহ্বান জানান এবং গঠনমূলক সম্পর্কের ওপর জোর দেন।
  • গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের প্রত্যাশা: মোদি একটি গণতান্ত্রিক, স্থিতিশীল, শান্তিপূর্ণ, প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ দেখতে চান, যেখানে নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
  • সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা: মোদি বাংলাদেশে হিন্দুসহ সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং সংঘটিত নৃশংসতার তদন্তের আশা করেন।
  • শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ: ইউনূস শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রসঙ্গ তুলেন এবং ভারতে তাঁর উসকানিমূলক বক্তব্য নিয়ে উদ্বেগ জানান।
  • সীমান্ত হত্যা: ইউনূস সীমান্তে হত্যা বন্ধের দাবি জানান; মোদি অবৈধ সীমান্ত অতিক্রম রোধে কঠোর আইন প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
  • পানি বণ্টন: গঙ্গার পানি চুক্তির নবায়ন ও তিস্তা চুক্তি নিয়ে ইউনূস আলোচনা করেন।
  • গঠনমূলক আলোচনা: উভয় নেতাই পারস্পরিক স্বার্থের বিষয়গুলো গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের প্রতিশ্রুতি দেন।
  • বিমসটেক সভাপতিত্ব: মোদি বাংলাদেশকে বিমসটেকের পরবর্তী সভাপতিত্ব গ্রহণের জন্য অভিনন্দন জানান এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধির আশা প্রকাশ করেন।
  • উপহার প্রদান: ইউনূস মোদিকে ২০১৫ সালে ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসে স্বর্ণপদক প্রদানের একটি ছবি উপহার দেন।
  • প্রাক-বৈঠক সাক্ষাৎ: গতকাল বৃহস্পতিবার বিমসটেক নৈশভোজে দুই নেতা পাশাপাশি বসে কুশল বিনিময় করেন।
  • বৈঠকের মূল্যায়ন: উভয় পক্ষ বৈঠকটিকে অত্যন্ত গঠনমূলক ও ফলপ্রসূ হিসেবে বর্ণনা করে।

বৈঠকের পর সংবাদ সম্মেলনে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি জানান, নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশে হিন্দুসহ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি আশা করেন, বাংলাদেশ সরকার এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেবে এবং সংখ্যালঘুদের ওপর সংঘটিত নৃশংসতার ঘটনাগুলোর পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করবে। মোদি আরও বলেছেন, যে কোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নিয়মিত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বাংলাদেশের সঙ্গে একটি ইতিবাচক ও গঠনমূলক সম্পর্ক গড়ে তুলতে ভারতের আগ্রহের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।

নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদি। ২০১৯ সালের ৫ অক্টোবর ছবিটি তুলেছেন টি নারায়ণ

অধ্যাপক ইউনূস বৈঠকে ভারতে পালিয়ে থাকা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রসঙ্গ তুলেছেন।

অন্যদিকে, প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানিয়েছেন, অধ্যাপক ইউনূস বৈঠকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রসঙ্গ তুলেছেন। তিনি ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনার উসকানিমূলক বক্তব্য, সীমান্তে হত্যা বন্ধ, গঙ্গার পানি চুক্তির নবায়ন এবং তিস্তা চুক্তির বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন। শফিকুল আলম বলেন, “আলোচনাটি অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে। পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট সব বিষয়ে কথা হয়েছে।”

বৈঠকটি স্থানীয় সময় মধ্যাহ্নের পর শুরু হয় এবং আধা ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলে। এর আগে গতকাল বৃহস্পতিবার বিমসটেক নেতাদের সম্মানে আয়োজিত নৈশভোজে দুই নেতার সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎ ও কুশল বিনিময় হয়েছিল। থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রার আয়োজনে ওই নৈশভোজে তাঁরা পাশাপাশি বসেছিলেন।

ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি আরও জানান, মোদি সীমান্তে আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং অবৈধ সীমান্ত অতিক্রম রোধে জোর দিয়েছেন। তিনি বলেন, “বিশেষ করে রাতে সীমান্ত অতিক্রম ঠেকানো সীমান্ত নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য।” এছাড়া, দুই দেশের সম্পর্ক পর্যালোচনা ও এগিয়ে নিতে প্রতিনিধি পর্যায়ে বৈঠকের প্রস্তাবও তিনি দিয়েছেন। মোদি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, পারস্পরিক স্বার্থের বিষয়গুলো গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব, যা দুই দেশের দীর্ঘস্থায়ী ও উপকারী সম্পর্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

নরেন্দ্র মোদিকে নিজেদের একটি পুরনো ছবি উপহার দেন মুহাম্মদ ইউনূস

নরেন্দ্র মোদিকে নিজেদের একটি পুরনো ছবি উপহার দেন মুহাম্মদ ইউনূস। সর্বডানে এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক লামিয়া মোরশেদ

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অধ্যাপক ইউনূস বৈঠকে নরেন্দ্র মোদিকে একটি বিশেষ উপহার দিয়েছেন। প্রধান উপদেষ্টার উপপ্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার জানান, এটি ২০১৫ সালের ৩ জানুয়ারি মুম্বাইয়ে অনুষ্ঠিত ১০২তম ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসে অধ্যাপক ইউনূসকে স্বর্ণপদক প্রদানের একটি ছবি। সেই সময় মোদি নিজে এই পদক তুলে দিয়েছিলেন। প্রধান উপদেষ্টার ফেসবুক পেজেও এ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।

গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর থেকে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছে। এই প্রেক্ষাপটে এই বৈঠকটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। অধ্যাপক ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই মোদির সঙ্গে তাঁর প্রথম সরাসরি আলোচনা। বিক্রম মিশ্রি শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রসঙ্গে বলেন, “এ বিষয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে একটি আবেদন এসেছে। তবে এখন এ নিয়ে বিস্তারিত বলা সমীচীন হবে না।”

বিমসটেক সম্মেলনে বাংলাদেশ পরবর্তী সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। মোদি এ জন্য বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানিয়েছেন এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধির আশা প্রকাশ করেছেন। সম্মেলনে অংশ নিতে অধ্যাপক ইউনূস গতকাল ব্যাংককে পৌঁছান।

এই বৈঠক দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। উভয় নেতাই পারস্পরিক স্বার্থ ও জনগণের কল্যাণে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন।

You may also like

Publisher : Khaled Saifullah Jewel
Editor : Hamim Kefayat
15/1, Paridas Road, Banglabazar, Dhaka 1100, Bangladesh
Contact : +8801712813999,
Mail : news@dhakabarta.net