স্টাফ রিপোর্টার ।।
সম্প্রতি প্রকাশিত সরকারের একটি শ্বেতপত্রে রাষ্ট্রীয় অর্থ অপব্যবহারের যেসব খাত চিহ্নিত করা হয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হিসেবে উঠে এসেছে ‘মুজিব ভাই’ অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রকল্প। শ্বেতপত্র অনুযায়ী, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের আওতাধীন সিআরআইয়ের মাধ্যমে নির্মিত এই চলচ্চিত্রে মোট ব্যয় দেখানো হয়েছে ৪ হাজার ২১১ কোটি ২২ লাখ টাকা। একই প্রতিবেদনে ‘খোকা’ চলচ্চিত্র নির্মাণে ১৬ কোটি টাকা বরাদ্দের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
শ্বেতপত্রে বলা হয়েছে, ডিজিটাল রূপান্তরের নামে আইসিটি খাতে একের পর এক প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও সেগুলোর বড় অংশই বাস্তব চাহিদা, সক্ষমতা ও টেকসই পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। হাই-টেক পার্ক, আইটি ট্রেনিং সেন্টার ও বিভিন্ন মেগা প্রকল্পে স্বজনপ্রীতি, সিন্ডিকেশন এবং অযৌক্তিক ব্যয়ের একাধিক নজির পাওয়া গেছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রশিক্ষক বা প্রশিক্ষণার্থী না থাকলেও প্রকল্পের সম্পূর্ণ অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে বলে শ্বেতপত্রে উল্লেখ করা হয়।
- সরকারি শ্বেতপত্রে রাষ্ট্রীয় অর্থ অপব্যবহারের বড় উদাহরণ হিসেবে চিহ্নিত ‘মুজিব ভাই’ অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র প্রকল্প
- সিনেমাটি নির্মাণে সিআরআই ও আইসিটি বিভাগের মাধ্যমে ব্যয় দেখানো হয়েছে ৪ হাজার ২১১ কোটি ২২ লাখ টাকা
- ‘খোকা’ চলচ্চিত্র নির্মাণে পৃথকভাবে ১৬ কোটি টাকা বরাদ্দের তথ্যও শ্বেতপত্রে উল্লেখ
- ডিজিটাল রূপান্তরের নামে আইসিটি খাতে নেওয়া বহু প্রকল্প বাস্তব চাহিদা ও সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না
- হাই-টেক পার্ক, আইটি ট্রেনিং সেন্টার ও মেগা প্রকল্পে স্বজনপ্রীতি ও সিন্ডিকেশনের অভিযোগ
- প্রশিক্ষক ও প্রশিক্ষণার্থী ছাড়াই বিল উত্তোলনের একাধিক নজির পাওয়ার দাবি শ্বেতপত্রে
- ‘লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং’ প্রকল্পে জাল প্রশিক্ষক নিয়োগ ও ভুয়া সার্টিফিকেট বিতরণের তথ্য
- কাগজে হাজার হাজার ফ্রিল্যান্সার তৈরি হলেও বাস্তবে বাজারে প্রবেশে ব্যর্থতার চিত্র
- শ্বেতপত্রটি প্রতিশোধমূলক নয় বলে দাবি; লক্ষ্য স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা
- আইসিটি খাতে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, স্বাধীন অডিট ও কঠোর নজরদারির সুপারিশ
- টিআইবি বলছে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া শ্বেতপত্র কার্যকর হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে
প্রতিবেদনে ‘লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট’-এর মতো প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে গুরুতর অনিয়মের কথাও তুলে ধরা হয়েছে। এতে জাল প্রশিক্ষক নিয়োগ, একই প্রশিক্ষণ একাধিকবার দেখিয়ে বিল উত্তোলন এবং প্রকৃত দক্ষতা ছাড়াই সার্টিফিকেট বিতরণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর ফলে কাগজে-কলমে হাজার হাজার ‘ফ্রিল্যান্সার’ তৈরি হলেও বাস্তবে তাদের বড় অংশই আন্তর্জাতিক বা স্থানীয় ফ্রিল্যান্সিং বাজারে প্রবেশ করতে পারেনি।
শ্বেতপত্রে আলোচিত ‘মুজিব ভাই’ চলচ্চিত্রটি ২০২৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত একটি অ্যানিমেটেড ফিচার ফিল্ম। শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মজীবনী The Unfinished Memoirs অবলম্বনে নির্মিত এই চলচ্চিত্রে ১৯৪৮ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত সময়ের রাজনৈতিক জীবন তুলে ধরা হয়েছে। ছবিটি যৌথভাবে পরিচালনা করেছেন সোহেল মোহাম্মদ রানা ও চন্দন কে. বর্মণ। চিত্রনাট্য লিখেছেন আদনান আদিব খান, গল্প ও স্ক্রিনপ্লে সম্পাদনা করেছেন অজয় দাশগুপ্ত। চলচ্চিত্রটির দৈর্ঘ্য ৪৭ মিনিট।
আইসিটি বিভাগের প্রযোজনায় নির্মিত এই অ্যানিমেশনটি তৈরি করেছে টেকনোম্যাজিক প্রাইভেট লিমিটেড ও হাইপারট্যাগ লিমিটেড। এটি আইসিটি বিভাগের ‘স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট অন মোবাইল গেমস অ্যান্ড অ্যাপ্লিকেশনস’-এর আওতায় বাস্তবায়িত হয়। ২০২৩ সালের ২৩ জুন ঢাকার স্টার সিনেপ্লেক্সে ছবিটির প্রিমিয়ার অনুষ্ঠিত হয়। পরে বঙ্গভবনেও বিশেষ প্রদর্শনী হয়, যেখানে রাষ্ট্রপতি ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা উপস্থিত ছিলেন।
শ্বেতপত্রে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, এই প্রতিবেদন কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক দলিল নয়। বরং ভবিষ্যতে নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এটি প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে আইসিটি খাতে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, স্বাধীন অডিট ব্যবস্থা জোরদার এবং কঠোর নজরদারি ব্যবস্থার সুপারিশ করা হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কার্যকর আইনি ব্যবস্থার অভাবে এই শ্বেতপত্রও অতীতের অনেক প্রতিবেদনের মতো ‘ফাইলবন্দি দলিল’ হয়ে থাকার ঝুঁকিতে রয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন,
“শ্বেতপত্রে তথ্যভিত্তিক দুর্নীতি ও অনিয়মের সুস্পষ্ট চিত্র উঠে এসেছে। কিন্তু এগুলো কার্যকর হবে তখনই, যখন সরকার প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি পর্যায়ে বাস্তব জবাবদিহি নিশ্চিত করবে।”
উল্লেখ্য, শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি গঠিত হয় উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. নিয়াজ আসাদুল্লাহর নেতৃত্বে। কমিটির অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে ছিলেন পিজিসিবি চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেজওয়ান খান, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক চৌধুরী মফিজুর রহমান, পারডু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুহাম্মদ মুস্তাফা হোসেন, বুয়েটের অধ্যাপক রিফাত শাহরিয়ার, ব্যারিস্টার আফজাল জামি সৈয়দ আলী, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ আসিফ শাহরিয়ার সুস্মিত এবং সাংবাদিক মো. শরিয়ত উল্লাহ।
