কুররাতুল আইন ।।
২০২৫ সাল বিশ্ব প্রযুক্তির ইতিহাসে এক সন্ধিক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই আর কেবল গবেষণাগারের পরীক্ষামূলক একটি ধারণা নয়; এটি বৈশ্বিক অর্থনীতি, রাষ্ট্রনীতি, নিরাপত্তা, শিক্ষা, সৃজনশীলতা, ব্যবসা ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অঙ্গ হয়ে উঠেছে। ভাষা বোঝা, সিদ্ধান্ত নেওয়া, যৌক্তিক বিশ্লেষণ, ছবি ও অডিও তৈরি, চিকিৎসা নির্ণয়, তথ্য ব্যবস্থাপনা—সবকিছুর কেন্দ্রে এখন এআই–এর প্রভাব স্পষ্ট। ফলে, মানব সভ্যতার গতিপথ নির্ধারণে এই প্রযুক্তি এমন ক্ষমতা অর্জন করেছে যা একসময় কল্পনাতীত ছিল।
এই বাস্তবতার ভিত্তিতেই ২০২৫ সালে টাইম ম্যাগাজিন একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেয়—বর্ষসেরা ব্যক্তিত্ব নির্বাচন করতে গিয়ে তারা কোনো একজনকে নয়, বরং ভিন্ন ভিন্ন কোম্পানির একটি পূর্ণ দলকে বেছে নিয়েছে: “দ্য আর্কিটেক্টস অব এআই”। কারণ এই আটজন বিভিন্ন কোম্পানি, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মে অবস্থান করে এআই–কে শুধুমাত্র তৈরি করেননি, বরং একে নীতি, নকশা, নিরাপত্তা, গণতন্ত্রায়ন, হার্ডওয়্যার–ইনফ্রাস্ট্রাকচার, বাণিজ্যিক প্রয়োগ এবং মানব–প্রযুক্তি সম্পর্কের ভবিষ্যৎ অভিমুখ পর্যন্ত গড়ে দিয়েছেন। তাদের প্রত্যেকের সিদ্ধান্ত কোটি কোটি মানুষের কাজ, সুযোগ, অধিকার, মূল্যবোধ এবং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যকে পরিবর্তন করছে।

টাইম ম্যাগাজিন, ২০২৫ বর্ষসেরার প্রচ্ছদ
এই প্রচ্ছদটি তাই মোটেও কেবল মর্যাদা প্রদর্শন নয়; এটি একটি প্রতীক—যে প্রযুক্তিগত শক্তি কীভাবে পৃথিবীর রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোকে নতুন করে নির্মাণ করছে, এবং সেই নির্মাণকাজের কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে আছেন এই আটজন স্থপতি। তাঁদের কাজ, সংগ্রাম, উদ্ভাবন ও তর্ক-বিতর্ক ২০২৫ সালের সর্ববৃহৎ আলোচনাপ্রবাহকে সংজ্ঞায়িত করেছে, যা মানব সভ্যতার ভবিষ্যৎ চেহারা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। নিচে সেই আটজনের সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হলো, তবে সেটা অবদান বা জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে নয়।
মার্ক জাকারবার্গ — সিইও, মেটা প্ল্যাটফর্মস
মার্ক জাকারবার্গ মেটা প্ল্যাটফর্মসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। সোশ্যাল মিডিয়া, ভার্চুয়াল যোগাযোগ ও সম্প্রদায়ের ডিজিটাল ইকোসিস্টেম গঠনে তাঁর নেতৃত্ব এআই-এর মাধ্যমে আরও ব্যক্তিগতকরণ ও কন্টেন্ট সিফটিং-এর দিকে পরিচালিত করেছে। এআই-চালিত অভিজ্ঞতা, ভাষান্তর, নিরাপত্তা টুল ও অনুসন্ধান অ্যালগরিদমে কোম্পানির উন্নয়ন জুকারবার্গকে প্রচ্ছদে স্থানের জন্য কেন্দ্রীয় করে তোলে।
লিসা সু — প্রেসিডেন্ট ও সিইও, এএমডি
লিসা স্যু অ্যাডভান্সড মাইক্রো ডিভাইসেস (এএমডি)-এর প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী। তিনি সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তির পরিবর্তন ও শক্তিশালী এআই-উপযোগী হার্ডওয়্যার উন্নয়নে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার অধীনে এএমডি এআই-চিপস ও এক্সিলারেটর প্রযুক্তি তৈরি করে প্রযুক্তি শিল্পে প্রতিযোগিতায় শক্ত অবস্থানে এসেছে, যা এআই প্রসেসিং সক্ষমতা বাড়িয়ে এআই-ভিত্তিক নৈতিকতা ও সম্ভাব্যতার ভিত্তি গড়ে দিয়েছে।
ইলন মাস্ক — সিইও, এক্সএআই
ইলন মাস্ক এক্সএআই-এর প্রধান নির্বাহী হিসেবে এআই-এর চেহারা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক ও বিনিয়োগে যুক্ত। তাঁর নেতৃত্বে তৈরি এআই সরঞ্জাম এবং চ্যাটবট-ধরনের প্রযুক্তি আলোচনা ও কার্যকর সিদ্ধান্তগুলো বিশ্বজুড়ে শিল্পনীতি ও নিরাপত্তা আলোচনায় স্থান পেয়েছে, তাই তিনি প্রচ্ছদে প্রদর্শিত হয়েছেন।
জেনসেন হুয়াং — প্রেসিডেন্ট ও সিইও, এনভিডিয়া
জেনসেন হুয়াং এনভিডিয়া’র সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী। জিপিইউ ডিজাইন ও এআই-চিপ উন্নয়নে তাঁর নেতৃত্ব এনভিডিয়া-কে এআই-এর “হৃদয়” হিসেবে পরিচিতি দিয়েছে, দ্রুতগতির কম্পিউটিং ও মেশিন লার্নিংয়ের ভিত্তি গড়ে তুলেছে। এআই-এর বিস্তৃতি ও শিল্পের মানোন্নয়নে এনভিডিয়া-এর অবদান প্রচ্ছদে তাঁর অবস্থান নিশ্চিত করেছে।
স্যাম অল্টম্যান — সিইও, ওপেনএআই
স্যাম অল্টম্যান ওপেনএআই-এর প্রধান নির্বাহী ও একজন মূল স্থাপত্যবিদ। তাঁর নেতৃত্বে চ্যাটজিপিটি-সহ জেনারেটিভ এআই মডেলগুলো বিশ্বব্যাপী মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ, শিক্ষা ও শ্রমশক্তিতে বিপ্লব সৃষ্টি করেছে। ২০২৫-এ এআই-এর আধিপত্যে তাঁরা অন্যতম কেন্দ্রীয় অবদানকারী, তাই তিনি এখানে অন্তর্ভুক্ত।
ডেমিস হাসসাবিস — সিইও, গুগল ডিপমাইন্ড
ডেমিস হাসসাবিস ডিপমাইন্ড-এর প্রধান গবেষণা ও নির্বাহী কর্মকর্তা। এআই-র গবেষণা ও উন্নয়ন, বিশেষত নিউরাল নেটওয়ার্ক, শক্তিযুক্ত শিক্ষণ ও গবেষণায় তাঁর দীর্ঘসময়ী অবদান ছিল যার ফলে ডিপমাইন্ড বিশ্বব্যাপী এআই-গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
ডারিও আমোডেই — সিইও, অ্যানথ্রপিক
ডারিও আমোডেই অ্যানথ্রপিক-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও, যিনি এআই-এর নিরাপত্তা, নৈতিক ব্যবহার ও “জবাবদিহিতা” বিষয়ক গবেষণা ও উন্নয়ন কেন্দ্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর নেতৃত্বে অ্যানথ্রপিক রোবাস্ট এবং নিরাপত্তা-নিশ্চিত এআই প্রদান করেছে।
ফেই–ফেই লি — সিইও, ওয়ার্ল্ড ল্যাবস
ফেই-ফেই লি একজন বিশ্বমানের কম্পিউটার বিজ্ঞানী ও এআই গবেষক, যিনি ইমেজনেট ডেটাসেটের মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-চালিত কম্পিউটার ভিশনকে ত্বরান্বিত করেছেন। তিনি স্ট্যানফোর্ড-এ এআই-অন্বেষণ ও মানব-কেন্দ্রিক এআই নীতি উন্নয়নে সক্রিয়, এবং নতুন স্পেশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (spatial intelligence)-সহ এআই প্রয়োগে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছেন।
২০২৫ সালে টাইম ম্যাগাজিন “দ্য আর্টিটেক্টস অব এআই”–কে বর্ষসেরা ব্যক্তিত্ব হিসেবে ঘোষণা করে মূলত একটি ঐতিহাসিক বার্তা দিয়েছে—যে প্রযুক্তি এখন আর কেবল শিল্প বা সিলিকন ভ্যালির ভেতরের সীমাবদ্ধ কোনো খেলা নয়, বরং তা বিশ্ব রাজনীতি, অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, সৃজনশীলতা, শিক্ষা, নৈতিকতা এবং মানবজীবনের প্রতিটি স্তরে গভীর পরিবর্তনের উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ২০২৫ সালে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে এটি মানব আচরণ বিশ্লেষণ, ভাষা বোঝা, সৃজনশীল লেখা, গবেষণা, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপত্তা, উৎপাদনশিল্প এমনকি ভূ-রাজনীতি পর্যন্ত প্রত্যেক ক্ষেত্রে বিরাট প্রভাব ফেলছে। এর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ যাঁদের হাতে, তাঁরা এখন বৈশ্বিক শক্তিকাঠামোর নতুন স্থপতি হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছেন।
এই কারণেই টাইম পৃথক ব্যক্তিকে নয়, একটি পূর্ণ দলকে বেছে নিয়েছে—যারা প্রত্যেকে তাদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে এআই-এর ভিত্তি নির্মাণ, নকশা, পরিচালনা, প্রসার এবং নিরাপত্তা-বিষয়ক দিকগুলোকে আকার দিয়েছেন। কেউ কেউ প্রযুক্তিকে গণতান্ত্রিক করেছেন, কেউ হার্ডওয়্যারকে দ্রুততর করেছেন, কেউ গবেষণাকে নতুন স্তরে তুলেছেন, কেউ এআই–এর নৈতিকতা ও নিরাপত্তায় কঠোর নজরদারি স্থাপন করেছেন, কেউ বা সমাজে এআই–এর গ্রহণযোগ্যতা সহজ করেছেন। সম্মিলিতভাবে, এঁরা বিশ্বব্যাপী নীতি-প্রণয়ন, ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা, গবেষণার ভবিষ্যৎ এবং মানব–প্রযুক্তি সম্পর্কের পরবর্তী যুগের কাঠামো তৈরি করছেন।
এই নির্বাচন আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিপ্রায় প্রকাশ করে—আর তা হলো এআই-কে ঘিরে উদ্ভূত অস্থিরতা, নৈতিক সংকট, নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং ভবিষ্যৎ আস্থার প্রশ্নগুলোকে সামনে আনা। এআই–এর সুবিধা যেমন প্রচুর, তেমনি এটি ভুল হাতে পড়লে বা ভুল নীতিতে পরিচালিত হলে মানবসভ্যতা বড় ধরনের বিপদের মুখোমুখি হতে পারে—এসব আলোচনার শীর্ষেই রয়েছেন এই স্থপতিরা। তাই টাইম ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে তাঁদের স্থান দেওয়ার মাধ্যমে ২০২৫-এর বিশ্ব বাস্তবতাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে: এআই এখন শুধু একটি প্রযুক্তি নয়—বরং এটি ভবিষ্যৎ সমাজের কেন্দ্রীয় শক্তি, এবং সেই ভবিষ্যৎকে আকার দিচ্ছেন এই আটজন স্থপতি।
